
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর ফলাফলের উপর ভিত্তি করে তাদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের গতিপথ অনেকাংশে নির্ধারিত হয়। তাই এই পরীক্ষার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ আয়োজন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা, ২০২৫ কে সামনে রেখে, এই পরীক্ষার বিভিন্ন দিক, বিশেষ করে এর আইনি সুরক্ষা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হলো।
পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধের জন্য বাংলাদেশে একটি সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে – পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন অনুযায়ী পরবর্তীতে এর বাংলা সংস্করণ প্রণীত হয়। এই আইনটি পাবলিক পরীক্ষার পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আইনটির ২(ঘ) ধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় বা বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত যেকোনো পরীক্ষাই পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে গণ্য।
আইনটিতে পরীক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যেমন, কোনো ব্যক্তি পরীক্ষার্থী না হয়েও পরীক্ষায় অংশ নিলে বা অন্যের নামে পরীক্ষা দিলে (ধারা ৩) সর্বোচ্চ ৫ বছর ও সর্বনিম্ন ১ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র বা এর অনুরূপ কোনো কিছু ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণ করলে (ধারা ৪) সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
একইভাবে, মার্কশিট, সার্টিফিকেট বা ফলাফলের কোনো অংশ পরিবর্তন করলে (ধারা ৫) ৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। জালিয়াতির মাধ্যমে মার্কশিট, সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি তৈরি, বিতরণ বা ব্যবহার করলে (ধারা ৬) সর্বোচ্চ ৭ বছর ও সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। উত্তরপত্র বা এর অংশবিশেষ পরিবর্তন করলে বা পরীক্ষার্থীর লেখা নয় এমন অতিরিক্ত পৃষ্ঠা যোগ করলে (ধারা ৮) সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
কোনো পরীক্ষার্থীকে অবৈধভাবে লিখিত বা মৌখিক উপায়ে বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করলে (ধারা ৯) সর্বোচ্চ ৫ বছর ও সর্বনিম্ন ২ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে বা পরীক্ষা কেন্দ্রে গোলযোগ সৃষ্টি করলে (ধারা ১১) ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থেকেও কেউ অপরাধ করলে (ধারা ১২) ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
এমনকি এই আইনের অধীনে যেকোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্রচেষ্টা করলেও (ধারা ১৩) মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি হবে। এই আইনের অধীনে অপরাধগুলো আমলযোগ্য এবং প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এর বিচার হয়। যদিও আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সময়ের সাথে সাথে অপরাধের ধরনে পরিবর্তন আসায় আইনটিকে আরও যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে এসএসসি নামে পরিচিত পরীক্ষাটি ব্রিটিশ আমলে ‘এন্ট্রান্স’ এবং পাকিস্তান আমলে ‘ম্যাট্রিকুলেশন’ বা ‘ম্যাট্রিক’ পরীক্ষা নামে প্রচলিত ছিল। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কলেজ বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করত এবং এটি সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সনদ হিসেবে বিবেচিত হতো। কালের পরিক্রমায় নাম ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও মাধ্যমিক স্তরের এই পাবলিক পরীক্ষার গুরুত্ব কমেনি, বরং বেড়েছে। এটি আজও শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষা ও কর্মজীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।
আসন্ন ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৯ লক্ষ ২৮ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে বলে জানা গেছে। তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম। যেমন, ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২০ লক্ষ ২৪ হাজার ১৯২ জন, ২০২৩ সালে ২০ লক্ষ ৭২ হাজার ১৬৩ জন এবং ২০২১ সালে ২২ লক্ষ ৪০ হাজার ৩৯৫ জন। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, যা উদ্বেগের বিষয়। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রশ্নফাঁসের গুজব, নকল প্রবণতা এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি। এগুলো মোকাবেলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষা কেন্দ্রে কেন্দ্র সচিব (শুধুমাত্র ক্যামেরা বিহীন বাটন ফোন) ছাড়া পরীক্ষার্থীসহ অন্য কারো মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশ্নফাঁসের গুজব ঠেকাতে ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরীক্ষা শুরুর নির্দিষ্ট সময় পূর্ব থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত সারা দেশের কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর নির্দিষ্ট সীমানার (সাধারণত ২০০ গজ) মধ্যে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে লোক সমাগম, মিছিল, মাইকিং ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
কেন্দ্রগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয় এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ কেন্দ্র পরিদর্শন ও সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ভিজিলেন্স টিম, ট্যাগ অফিসার এবং কেন্দ্র কমিটি সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকেন। কেন্দ্রের আশেপাশে ফটোকপির দোকান বন্ধ রাখা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে অন্যান্য দেশের উদ্যোগও প্রণিধানযোগ্য। সম্প্রতি ভারতে পাবলিক পরীক্ষা (অন্যায় প্রতিরোধ) আইন, ২০২৪ পাস হয়েছে। এই আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষার্থীকে অবৈধ সহায়তা, কম্পিউটার নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপ, ভুয়া পরীক্ষা বা নথি তৈরি সহ বিভিন্ন অসদুপায় অবলম্বনের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৩ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই ধরনের কঠোর ও আধুনিক আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এসএসসি পরীক্ষা কেবল একটি একাডেমিক মূল্যায়ন নয়, এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ যা একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার প্রথম সোপান। এই পরীক্ষার সুনাম ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সকলের সম্মিলিত সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নৈতিকতার চর্চার মাধ্যমেই কেবল একটি সুষ্ঠু পরীক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং একটি শিক্ষিত ও নৈতিক জাতি গঠন সম্ভব।
লেখক : সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, নরসিংদী।
