
গত আট মাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যার ফলে দেশব্যাপী ৫১ জন নেতাকর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে এবং চার শতাধিক আহত হয়েছেন।
গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে কর্মীদের রেষারেষি, নেতাদের বিরোধ, মূল দলের সঙ্গে অঙ্গসংগঠনের মতপার্থক্য, স্বার্থের সংঘাত এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে কেন্দ্র করে অন্তত ৪৮টি সংঘর্ষের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এই হতাহতের চিত্র পাওয়া গেছে, যেখানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধজনিত হত্যাকাণ্ডগুলোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; জমিজমা বা অন্য ব্যক্তিগত বিবাদের ঘটনাগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে চট্টগ্রাম জেলায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখিত আট মাসে সারাদেশে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যত নেতাকর্মী অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন, তার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ জনই চট্টগ্রামের।
এই জেলায় আধিপত্য বিস্তার এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণের লড়াই বিশেষভাবে তীব্র আকার ধারণ করেছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘটা সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলায় চারজন, চট্টগ্রাম মহানগরে তিনজন, ফটিকছড়ি উপজেলায় দুজন এবং মিরসরাই উপজেলায় দুজন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এসব এলাকায় একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা দলের তৃণমূল পর্যায়ে তীব্র বিভাজন এবং অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও এই সংঘাতের মূলে রয়েছে দলীয় পদ-পদবি নিয়ে কাড়াকাড়ি, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন পরিবহন স্ট্যান্ড, হাটবাজার, ঘাট বা ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সৃষ্ট এই বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ৪৭ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যও এই অভ্যন্তরীণ সহিংসতার ব্যাপকতা তুলে ধরে, যেখানে শুধুমাত্র চলতি বছরের মার্চ মাসেই বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৭ জন নিহত এবং ৫০২ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা অনুসন্ধানে পাওয়া সংখ্যার (মার্চে ১৩ জন নিহত) চেয়ে কিছুটা বেশি। তবে উভয় সূত্রই মার্চ মাসকে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী মাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
চট্টগ্রামে ঘটা এই প্রাণহানিগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দলটির গভীরে শিকড় গেড়ে বসা বিভেদ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মরিয়া চেষ্টার প্রতিফলন। দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন যেমন যুবদল, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের নেতারাও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন এবং নিহতদের তালিকায় তাদের নামও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, গত আট মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যে ৫১ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের ১৩ জনের মৃত্যু এই জেলার রাজনীতিতে গভীর সংকট এবং চ্যালেঞ্জকেই নির্দেশ করছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র দলের সাংগঠনিক কাঠামোকেই দুর্বল করছে না, বরং একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।
এই বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। দলের ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা থেকে কোনো সংঘাত-সংঘর্ষ কাম্য নয়। বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে। কোনো লোভ-লালসার সঙ্গে বিএনপির আদর্শ যায় না। তবু যারা এসব করছে, তাদের বিরুদ্ধে তো দল প্রতিনিয়ত ব্যবস্থাও নিচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় দেড় হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
সারাদেশে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুনোখুনি নিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে এখন যেটি ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে, সেটি অপপ্রচার। কারণ, যখনই কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, সেটি যত বড় নেতার বিরুদ্ধেই হোক, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দলের মধ্যে এখন অনেক সুবিধাবাদী প্রবেশ করেছে। এরাই মূলত বিভিন্ন অপকর্ম করছে। আর এর দায় নিতে হচ্ছে পুরো দলকে। এদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
