- দশ বছর আগে ঢাকায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক
বাংলাদেশে গত বছরের আগস্টে সংঘটিত নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রতিবেশী ভারতের দীর্ঘদিনের হিসাব-নিকাশকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, নয়াদিল্লি তার পূর্বাঞ্চলীয় এই প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী ছিল – সেটি হলো আওয়ামী লীগ। ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখার’ এই নীতি এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সঙ্গে ভারতের শীতল সম্পর্ক সুবিদিত ছিল। দিল্লির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হতো, অতীতে বিএনপি শাসনামলের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না, যা দুই পক্ষের মধ্যে গভীর আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল। অন্যদিকে, বিএনপি বরাবরই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, তারা নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিরোধী এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চায়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা ভারত-বিরোধী।
২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠনের পর বিএনপি এই শীতলতা কাটিয়ে একটি নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করেছিল। তাদের হয়তো ধারণা ছিল, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিপরীতে বিজেপির সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া সহজ হতে পারে। দিল্লির অশোকা রোডে বিজেপির তৎকালীন সদর দপ্তরে বিএনপির প্রতিনিধিরা যাতায়াত করেছেন, দলের প্রভাবশালী নেতা রাম মাধবের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি। বরঞ্চ, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে একটি শক্তিশালী ব্যক্তিগত ও সরকারি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশে পরপর তিনটি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নয়াদিল্লির প্রচ্ছন্ন সমর্থন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিই থেকে যায়, যা বিএনপির মধ্যে ভারত সম্পর্কে অবিশ্বাসকে আরও ঘনীভূত করে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এই সমীকরণকে আমূল বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের আকস্মিক পতন এবং নিকট ভবিষ্যতে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃশ্যমান লক্ষণের অনুপস্থিতিতে, দিল্লির নীতি নির্ধারক এবং পর্যবেক্ষকদের অনেকেই এখন বিএনপির দিকে নতুন করে দৃষ্টি দিচ্ছেন। বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে দলটির ভালো করার সম্ভাবনা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিই যে ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হয়ে উঠেছে, তা অনস্বীকার্য। এই পরিস্থিতিতে, ভারতের কিছু নির্দিষ্ট উদ্বেগ বা ‘কোর কনসার্ন’ যদি বিএনপি আমলে নেয়, তবে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকেও সহযোগিতার হাত বাড়াতে দ্বিধা থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা প্রত্যাশা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছিল এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে অস্ত্রের চালান পাচার হয়েছিল বলে ভারত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। ভারতের সাবেক হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস যেমনটা বলেছেন, সেই সময়ের রেকর্ড ভারতের বিবেচনায় থাকবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক শান্তনু মুখার্জি মনে করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে যদি ভারতের এই নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোকে যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করে, বিশেষ করে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশ্রয় না দেয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুবিধার মতো বিষয়গুলো বহাল রাখে, তবে ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক উন্নয়নে কোনও বাধা থাকার কথা নয়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশে বসবাসকারী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির কাছে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। বিজেপি নেতা ও পার্লামেন্টারিয়ান শমীক ভট্টাচার্য বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে একটি মূল ভিত্তি হবে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিয়ে ভারতে উদ্বেগ তৈরি হলেও বাস্তবে তেমন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আলোচনা চলছে।
তৃতীয়ত, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ভারতের জন্য বরাবরই একটি অস্বস্তির কারণ। ভারতের নীতিনির্ধারকরা জামায়াতের আদর্শকে সন্দেহের চোখে দেখেন। সম্প্রতি বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব তৈরির যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেটিকে দিল্লি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। রিভা গাঙ্গুলি দাসও এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আগামী দিনে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কতটা গভীর হবে, তার অন্যতম নির্ধারক হতে পারে জামায়াতের সঙ্গে দলটির সম্পর্কের চূড়ান্ত রূপরেখা। তারেক রহমানের মতো বিএনপির পরবর্তী প্রজন্মের নেতারা জামায়াত সম্পর্কে কী অবস্থান নেন, সেদিকেও দিল্লির নজর থাকবে।
চতুর্থত, অতীতে বিএনপি নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে ‘ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি’ চর্চার যে অভিযোগ ছিল, তা থেকে দলটি কতটা সরে আসবে, সেটিও একটি বিবেচ্য বিষয়। বিএনপি নেতারা যদিও বলেন তারা ভারতের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক চান, কিন্তু নির্বাচনী বক্তৃতায় বা রাজনৈতিক প্রয়োজনে ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। শান্তনু মুখার্জির আশঙ্কা, খালেদা জিয়া দেশে ফিরে নির্বাচনী প্রচারে নামলে জনতুষ্টির জন্য হয়তো আবারও ভারত-বিরোধী বক্তব্য দিতে পারেন। তবে, রিভা গাঙ্গুলি দাসের মতে, এখন সময় এসেছে বিএনপির পক্ষ থেকে সামগ্রিকভাবে ভারতের প্রতি তাদের নীতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার, যা একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি করতে পারে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের ঢাকা সফর নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারত এবার অনেক বেশি সতর্ক। নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনও একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ার বার্তা দিতে চায় না। তারা বারংবার একটি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথাই বলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ব্যাংককে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে এই বার্তারই পুনরাবৃত্তি করেছেন এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন। শমীক ভট্টাচার্য যেমনটা বলেছেন, নির্বাচনের আগে কোনও দলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করলে তা একটি বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ আচরণের ভুল বার্তা দেবে। তাই ভারতের বর্তমান কৌশল হলো, নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং যে দলই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জয়ী হয়ে আসুক, তাদের সঙ্গে দেশের স্বার্থ ও পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা।
সুতরাং, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও বিএনপির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি হলেও তা এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ। নির্বাচনের আগে কোনও প্রকাশ্য উষ্ণতা দেখা না গেলেও, পর্দার আড়ালে উভয় পক্ষই একে অপরের অবস্থান ও নীতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আগামী দিনের নির্বাচন, ভারতের নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রতি বিএনপির সাড়া এবং জামায়াত প্রসঙ্গে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই বলে দেবে এই সম্ভাব্য নতুন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

