অনিশ্চয়তায় প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম : কখনও আশাতীত লাভবান হচ্ছেন। আবার কখনও পুঁজি হারিয়ে পথে বসছেন। এই হলো চট্টগ্রামের ছোট ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারীদের অবস্থা। বাচ্চা ও ফিডের ক্রমাগত দাম বৃদ্ধির ফলে প্রান্তিক খামারিদের ব্যবসায় ব্যয় বাড়ছে, মুনাফা কমছে। তাদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাজারে এর সমান বা তার চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে এগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যাদের বেশিরভাগই প্রান্তিক খামারী। গত কয়েক দশকে নীরবে পোল্ট্রি শিল্পের বিপ্লব ঘটার পেছনে প্রান্তিক খামারিদের বড় অবদান আছে। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও নজরদারি না বাড়ানো, করারোপসহ নানা কারণে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলায় লেয়ার, ব্রয়লার ও ব্রিডার মিলিয়ে ৪ হাজার ৬৬৬টি খামার রয়েছে। গত এক বছরে কতটি প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়েছে সে তথ্য জানা নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে উৎপাদন কমার কথা স্বীকার করেছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার খাগরিয়ায় ২০১৩ সালের শুরুতে একটি খামার পড়ে তোলেন বেকার যুবক রফিকুল ইসলাম রফিক। তখন এক হাজার মুরগির বাচ্চা তোলেন খামারে। মাত্র এক বছরের মাথায় ভালো লাভের মুখ দেখেন তিনি। এরপর খামার আরও বড় করেন। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতি মাসে তিন হাজার মুরগী উৎপাদন হচ্ছিলো রফিকের খামারে। কিন্তু পরের বছরের শুরুতে ক্রমাগত বাচ্চা ও খাবারের দাম বৃদ্ধির ফলে টানা কয়েকমাস লোকসানের মুখে পড়েন তিনি।

এরপর বাধ্য হয়ে খামারগুলো বন্ধ করে দেন রফিক; তিনি বলেন, ‘ছোট পুঁজি নিয়ে পোল্ট্রি ব্যবসা করা আসলেই খুব কঠিন। বড় কোম্পানীগুলো একদিকে বেশ লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের মতো ছোট খামারীরা কেন সময় লাভ আবার কোন সময় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ বড় কোম্পানিগুলো নিজেরাই বাচ্চা, খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন করে, অথবা নিজেরাই আমদানি করে। অন্যদিকে বড় কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে বাচ্চা, খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কিনে আমাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে। তাই বড় কোম্পানীগুলোর কোন ক্ষতি হয় না।’

পটিয়ার গোবিন্দরখীল এলাকায় মুরগীর খামার করেছেন শওকত আকবর সুমন; তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক পর্যায়ে পোল্ট্রি ব্যবসায় এখন আগের মতো লাভ নেই। বর্তমানে ৫০-৬০ টাকায় প্রতিটি বাচ্চা এবং গড়ে ৫০ টাকায় প্রতিকেজি পোল্ট্রি ফিড কিনতে হচ্ছে। একটি মুরগির বাচ্চাকে বিক্রয়োপযোগী করতে অন্তত আড়াই কেজি খাদ্য দিতে হয়। এছাড়াও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিটি মুরগিতে ১৮০-১৯০ টাকা খরচ পড়ছে। তাই লাভ হলেও সেটা সামান্য।’

সুমনের দাবি, ‘মুরগী ও ডিমের দাম কেমন হবে- তা নিয়ন্ত্রণ করে পোল্ট্রি শিল্পের বড় কোম্পানিগুলো। তারা মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ায় বিভিন্ন সময়ে। একই সময়ে আবার খাবারের দাম বাড়ে-কমে। খাবারের দাম কম থাকার পাশাপাশি বড় কোম্পানীগুলো মুরগীর দাম বাড়ালে প্রান্তিক খামারীরাও বেশী দামে বিক্রির সুযোগ পান। অন্যদিকে বড় খামারীরা কম দামে মুরগি ও ডিম বিক্রি করলেও তাদের লাভ থাকে। কারণ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন করে অথবা আমদানি করে। তাই এই ব্যবসা এখন বড় গ্রুপগুলোর দখলে চলে যাচ্ছে। অনেক প্রান্তিক খামারি এই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।’

চন্দনাইশের সাতবাড়িয়া গ্রামের পোল্ট্রি খামারি মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘পোল্ট্রি খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণসহ পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে এ খাত। এ জন্য ডিম, মুরগির মাংস ও খাদ্যের সুনির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ থাকা উচিত। মুরগি ও ডিমের বাজার তৈরি এবং ভর্তুকি না দিয়ে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা দরকার। তাহলে পোল্ট্রি খাত থেকে উৎপাদিত ডিম ও মুরগি একসময় বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এসব নিশ্চিত না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ের পোল্ট্রি ব্যবসায় লাভ কম হচ্ছে।’

সাতকানিয়ার খাগরিয়া মাইজপাড়া এলাকার খামারী মো. ইউনুস বলেন, মাংসের জন্য প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা খরচ হয়। আর খামারীরা ৫-৭ টাকা কমবেশি পাচ্ছেন। অথচ খুচরা বাজার মূল্য কেজি প্রতি ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। সোনালী জাতের মুরগি উৎপাদনে প্রতি কেজি ১৮০-১৯০ টাকা খরচ হয়। ৪-৫ টাকা খামারিরা কম-বেশী পান। আর খুচরা বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকার বেশী।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রেয়াজুল হক জসিম বলেন, ‘বড় পুঁজি ছাড়াই ব্যবসায় নেমে পড়েন প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা। এরপর খামার চালাতে গিয়ে তারা বাকিতে বাচ্চা ও খাদ্য কিনছেন বড় কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে। মুরগির ডিম ও মাংসের মূল্য নির্ধারণ নেই। এটি ওঠানামা করে। মধ্যস্বত্বভোগীরাও লাভের বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ছোট খামারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।’

বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) আহবায়ক মসিউর রহমান বলেন, ‘কর অব্যাহতি সুবিধা থাকায় ছোট পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এই খাতে করারোপের পর নানামুখি সংকট তৈরি হয়েছে। কর অব্যাহতি সুবিধা থাকলে এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বেশি হতো। এতে বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিরাও কম খরচে উৎপাদন করতে পারতো। মুরগির মাংস ও ডিমের দাম আরো কমতো।’