সুতার আমদানি রুট বদল: স্বস্তি ফিরবে কি দেশীয় স্পিনিং মিলে?


বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী – এই বন্দরগুলো দিয়ে এতদিন সুতা আসত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই সুবিধা বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের বস্ত্রখাতে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে আসা সুতার ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণা এবং কম দাম দেখানোর অভিযোগ করে আসছিলেন। তারা বলছিলেন, কাগজে-কলমে যে পরিমাণ সুতা আমদানির কথা বলা হয়, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি সুতা দেশে প্রবেশ করে। স্থলবন্দরগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় এবং সুতার মান যাচাইয়ের যন্ত্রপাতির অভাবে প্রতিটি চালান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।

অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু আমদানিকারক কম মানের (যেমন ৩০ কাউন্ট) সুতার চালানের ঘোষণা দিয়ে ভেতরে বেশি মানের (যেমন ৮০ কাউন্ট) সুতা নিয়ে এসেছেন। সুতার মান বা কাউন্ট যত বেশি হয়, দামও তত বাড়ে। এভাবে একদিকে সরকার যেমন সঠিক শুল্ক থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল, অন্যদিকে দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছিল।

ব্যবসায়ীরা আরও জানিয়েছেন, ভারতে উৎপাদিত সুতার দাম বাংলাদেশের বাজারে উৎপাদিত সুতার চেয়ে গড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কম রাখা হতো। বিশেষ করে স্থলবন্দর দিয়ে আসা সুতার দাম ছিল বেশ কম। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, স্থলপথে কম দামে সুতা এনে বেনাপোলের আশেপাশে মজুত করা হতো এবং অর্ডার পাওয়ার সাথে সাথেই সরবরাহ করা হতো। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন, তুরস্ক বা উজবেকিস্তান থেকে আমদানি করা সুতার দাম এবং দেশে উৎপাদিত সুতার দাম প্রায় কাছাকাছি থাকলেও, স্থলপথে আসা ভারতীয় সুতার অস্বাভাবিক কম দাম দেশীয় মিলগুলোর জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছিল।

স্থলবন্দরগুলোতে সুতার কাউন্ট বা সূক্ষ্মতা মাপার যন্ত্রপাতির অভাব একটি বড় সমস্যা। কয়েক বছর আগে বেনাপোল বন্দরে এ ধরনের যন্ত্রপাতি বসানো হলেও তা দ্রুত অকেজো হয়ে যায়। ফলে মিথ্যা ঘোষণা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। শুল্ক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, স্থলপথে আসা সুতার চালানের সঠিক শুল্কায়ন নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জ। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য এলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়। সমুদ্রপথে আমদানি হলে একটি নির্দিষ্ট বন্দর দিয়েই সব পণ্য আসে, এতে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং নজরদারি বাড়ানো যায়।

সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা হচ্ছে। প্রথমত, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নিম্নমানের দামে উচ্চমানের সুতা আনা বন্ধ হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বা স্পিনিং মিলগুলো একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ পাবে। অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে।

অনেকে মনে করতে পারেন, স্থলপথ বন্ধ হওয়ায় ভারত থেকে সুতা আনতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভারতের কর্ণাটক, তামিলনাড়ু বা গুজরাট থেকে সড়কপথে সুতা আসতে যেখানে ১০-১২ দিন সময় লাগে, সেখানে চেন্নাই সমুদ্রবন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজে সুতা আসতে সময় লাগে প্রায় দুই সপ্তাহ। অর্থাৎ, সমুদ্রপথে সময় হয়তো তিন-চার দিন বেশি লাগতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে একটি বড় সুবিধা হলো, জাহাজে সুতা আনার পরিবহন খরচ স্থলপথের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম। ফলে আর্থিকভাবে আমদানিকারকরা লাভবানই হতে পারেন।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) একজন পরিচালক জানিয়েছেন, নিট পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে ৩২ শতাংশ বেশি সুতা আমদানির সুযোগ ছিল, যা স্থলপথে অপব্যবহার করা হচ্ছিল। স্থলপথে আমদানি বন্ধ হওয়ায় এই অনিয়ম বন্ধ হবে এবং স্থানীয় উৎপাদকরা উপকৃত হবেন।

তথ্য বলছে, গত বছর দেশে প্রায় ১২ লাখ টন সুতা আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশেরও বেশি এবং বিগত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর একটি বড় অংশই এসেছে ভারত থেকে। দেশে বর্তমানে ৫১৯টি স্পিনিং মিল রয়েছে, যা নিট পোশাকের জন্য প্রয়োজনীয় সুতার প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের জন্য প্রয়োজনীয় সুতার প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করে। এত সক্ষমতা থাকার পরও শুধু দাম কিছুটা কম হওয়ায় ভারতীয় সুতার আমদানি বাড়ছিল।

অবশ্য আমদানি বাড়ার পেছনে আরও কিছু কারণ ছিল। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে দেশের অনেক স্পিনিং মিল তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছিল না। গত দুই বছরে গ্যাসের দাম কয়েকগুণ বাড়ায় উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে গেছে। পাশাপাশি, দেশি সুতা ব্যবহারে রপ্তানিকারকদের জন্য নগদ সহায়তার হার কমানো হয়েছিল, যা অনেককে আমদানির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তটি স্বল্পমেয়াদে কারো কারো জন্য অসুবিধার মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের বস্ত্রখাত, বিশেষ করে সুতা উৎপাদনকারী মিলগুলোর জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং অসম প্রতিযোগিতা দূর হয়ে দেশীয় শিল্পগুলো সুরক্ষার সুযোগ পাবে। সমুদ্রপথে তুলনামূলক কম খরচে সুতা আনার সুযোগ থাকায় সামগ্রিকভাবে হয়তো সুতার দামের উপরও এর তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ যা দেশের অর্থনীতি ও শিল্পের জন্য ইতিবাচক হবে।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।