সম্ভাবনার পোল্ট্রি শিল্প

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম : এক সময় আমদানি করতে হতো ডিম এবং ব্রয়লার মুরগি। এখন তা শূন্য। আগে গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম ছিল না পুরোটাই ছিল আমদানি নির্ভর। এখন বাংলাদেশে ৭টি জিপি ফার্ম আছে। আর প্যারেন্টস্টক (পিএস) ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। সবমিলিয়ে আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প। এই খাতে নিরব বিপ্লব হয়েছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে। ২০১৪ সালে দেশে বার্ষিক ডিম উৎপাদন ছিল ৬৩৯ কোটি, ২০১৫ সালে ৭১২ কোটি এবং ২০১৬ সালে ডিম উৎপাদন ছিল ৮২১ কোটি। ২০২১ সাল নাগাদ বার্ষিক ডিমের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি। বর্তমানে দেশে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে।

মুরগীর মাংসের বার্ষিক উৎপাদন ২০১৪ সালে ছিল ৫ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন, ২০১৫ সালে ৫ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০১৬ সালে ছিল ৬ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০২১ সালে দেশে মুরগির মাংসের চাহিদা হবে প্রায় ১২ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত, যার প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। অন্যদিকে, পোল্ট্রি শিল্পে বর্তমানে বিনিয়োগ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ২ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগে শতভাগ প্যাকেটজাত ফিড আমদানি করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে প্যাকেটজাত ফিড আমদানি করতে হয় না। দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৮৬টি ফিডমিল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে আধুনিক এবং নিবন্ধিত ফিড মিলের সংখ্যা প্রায় ৭০টি। আগে পোল্ট্রি শিল্পে প্রয়োজনীয় ভুট্টার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হতো। এখন চাহিদার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ ভুট্টা দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। চালের কুঁড়া বা রাইস পলিসও দেশীয়ভাবে পাওয়া যাচ্ছে। আগে দেশীয়ভাবে হাঁস-মুরগির তেমন কোনো ওষুধ তৈরি হত না। পুরোটাই ছিল আমদানি নির্ভর। কিন্তু এখন প্রায় ৩০টি কোম্পানী দেশীয়ভাবে বিভিন্ন ওষুধ তৈরি করছে। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, দেশে মুরগির মাংসের উৎপাদন প্রতিবছর বাড়ছে। আশির দশকে পোল্ট্রি খাতে বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০২১ সাল নাগাদ পোল্ট্রি খাতে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

তিনি আরও বলেন, কর অব্যাহতি সুবিধা থাকায় বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পরও ব্যবসায়ীরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এই খাতে করারোপের পর নানামুখি সংকট তৈরি হয়েছে। এরপরও সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অচিরেই আমরা রফতানিতে যেতে পারবো। ২০০৫ সালের আগে বাচ্চা, হ্যাচিং ডিম রফতানি হতো। এখন এগুলোর পাশাপাশি মাংস, নাগেটসহ অন্যান্য প্রোডাক্ট রফতানি সম্ভব।

তিনি বলেন, রফতানিতে যেতে হলে আগামী পাঁচ বছরে এই খাতে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করতে হবে। বড় কোম্পানিগুলো এখন এই খাতে বিনিয়োগ করছে। কর অব্যাহতি সুবিধা থাকলে বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বেশি হতো। বিনিয়োগের স্বার্থে এ শিল্পের ওপর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সব ধরনের কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত।

ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এ কে এম সাইফুদ্দিন বলেন, পোল্ট্রি শিল্পের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এখন। এ খাতে রপ্তানির সুযোগ তৈরী হয়েছে। বেকারত্ব দূরীকরণে ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পোল্ট্রি শিল্প ব্যাপক ভ’মিকা রাখছে। তবে পোল্ট্রি উপকরণ আমদানিতে সরকারের উচিত আরও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া। এতে এই শিল্পে আরও বিনিয়োগ বাড়বে।