স্থানীয় সরকার সংস্কার: চট্টগ্রাম পাবে ‘মহানগর সরকার’, বিলুপ্ত হচ্ছে গ্রাম আদালত?


দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য দুই স্তরবিশিষ্ট ‘মহানগর সরকার’ ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। একইসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতির বদলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের সামনে কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরেন এর প্রধান তোফায়েল আহমেদ।

কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকা ও চট্টগ্রামের জন্য দুই স্তরবিশিষ্ট মহানগর সরকার গঠন করা যেতে পারে। তবে মধ্য মেয়াদে অন্যান্য সিটি করপোরেশনে এ ধরনের সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে।

স্থানীয় সরকার কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন এনে কমিশন ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচন না করার সুপারিশ করেছে। এর বদলে প্রথমে ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করা হবে। পরে এই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের মেয়র বা চেয়ারম্যান নির্বাচন করবেন।

এ প্রসঙ্গে কমিশনের প্রধান তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদের উদাহরণ টেনে বলেন, “প্রথমে সংসদ সদস্য নির্বাচন করা হয়। এরপর তাঁদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। স্থানীয় সরকারের সব স্তরেও শুধু সদস্য ও কাউন্সিলর নির্বাচন হবে… এরপর সভাপতি (সভাধ্যক্ষ) নির্বাচন করা হবে… সভাপতির সভাপতিত্বে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচন করা হবে।”

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়, নির্বাচিত মেয়র বা চেয়ারম্যান ৩ থেকে ৫ সদস্যের একটি পূর্ণকালীন কাউন্সিল গঠন করবেন যারা পূর্ণ বেতন-ভাতা পাবেন। বাকি সদস্যরা খণ্ডকালীন হিসেবে বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব পালন করবেন। এতে সরকারি চাকরিজীবীদেরও খণ্ডকালীন সদস্য হওয়ার সুযোগ থাকবে বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলররা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন।

কমিশন উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ পদমর্যাদার বিচারক দিয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) আদালত স্থাপনের সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের অধীন গ্রাম আদালত বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর জনবল, কাজ ও অর্থ পুরোপুরি হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের মডেলে সমতলের জেলা পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে যথাক্রমে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করা এবং কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে এর সেবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘স্থানীয় সরকার জনপ্রতিষ্ঠান ও জনপ্রকৌশল সেবা মন্ত্রণালয়’ করারও সুপারিশ এসেছে।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, মূল সংস্কার না করে নির্বাচন করলে কোনো লাভ হবে না। তাই সংস্কারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে না পরে হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিশন এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেনি। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলমান শূন্যতা দূর করে স্থিতিশীলতা আনা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর তোফায়েল আহমেদকে প্রধান করে আট সদস্যের এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল।