
জনসংখ্যা ও আয়তনের ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সংখ্যা বিদ্যমান ৯টি থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৩৯টি করার সুপারিশ করেছে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। একইসাথে, নির্বাচনের জন্য উপজেলা ও জেলা পরিষদেও ওয়ার্ড গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বাধীন কমিশন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এমন আমূল পরিবর্তনসহ মোট ৫১টি সুপারিশ তুলে ধরেছে।
কমিশন বলছে, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জনসংখ্যা ও আয়তনে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। কোথাও জনসংখ্যা চার হাজার, আবার সাভারের ধামসোনার মতো ইউনিয়নে তা চার লাখেরও বেশি। রাঙামাটির সাজেকের মতো বিশাল আয়তনের ইউনিয়নও রয়েছে। এই অসমতা দূর করতে এবং পরিষদ সংখ্যা বাড়িয়ে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি না করে ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।
জনসংখ্যার অনুপাতে ওয়ার্ড বিভাজন
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সংখ্যা জনসংখ্যা ও আয়তনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। যেমন:
* আড়াই লাখের বেশি জনসংখ্যার ৭টি ইউনিয়নে ৩৯টি ওয়ার্ড।
* দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখের কম জনসংখ্যার ৫টি ইউনিয়নে ৩৬টি ওয়ার্ড।
* এক লাখ থেকে দেড় লাখের কম জনসংখ্যার ৯টি ইউনিয়নে ৩৩টি ওয়ার্ড।
* ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজারের কম জনসংখ্যার ৩০৩টি ইউনিয়নে ২৭টি ওয়ার্ড।
এভাবে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য জনসংখ্যা অনুপাতে ওয়ার্ড সংখ্যা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যার সর্বনিম্ন সংখ্যা হবে ৯টি। কমিশন মনে করে, নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী এই ওয়ার্ড সংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারে।
উপজেলা ও জেলায় নির্বাচনী ওয়ার্ড
বর্তমানে উপজেলা পরিষদে কোনো ওয়ার্ড নেই। কমিশন সুপারিশ করেছে, প্রতিটি উপজেলাকে ছোট ও মাঝারি ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তিনটি এবং বড় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে পাঁচটি নির্বাচনী ওয়ার্ড বা এলাকায় বিভক্ত করা হবে। একইভাবে জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য তিন থেকে পাঁচটি ওয়ার্ডে বিভক্ত হতে পারে। তবে এই ওয়ার্ডগুলো কেবল নির্বাচনের জন্য ব্যবহৃত হবে, সদস্যদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে না, কারণ সেসব এলাকার দেখভাল করবে ইউনিয়ন পরিষদ।
শপথ ও নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তন
স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নির্বাচিত সদস্যরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে শপথ না নিয়ে, নিজ নিজ ভোটার সমাবেশে উপস্থিত হয়ে নিজ ধর্মগ্রন্থে হাত রেখে উচ্চস্বরে শপথনামা পাঠ করবেন এবং তাতে স্বাক্ষর করবেন।
এছাড়া ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সংসদীয় পদ্ধতির আদলে করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে ভোটাররা সরাসরি ভোটে সদস্য বা কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন। পরে নির্বাচিত সদস্য ও কাউন্সিলরদের ভোটে চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচিত হবেন।
কাঠামোগত সংস্কার
কমিশন জেলা পরিষদকে একটি বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনা ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় বাদে জেলার সকল উন্নয়ন ও সেবাসংক্রান্ত দপ্তরগুলো জেলা পরিষদে ন্যস্ত থাকবে এবং একজন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হবেন এর মুখ্য নির্বাহী। তবে ডিসি আগের মতোই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন।
একইভাবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে সংশ্লিষ্ট স্তরের দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী, কাজ ও অর্থসম্পদ পরিষদের অধীনে আসবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অবশ্য ডিসির অধীনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবেই থাকবেন, তিনি উপজেলা পরিষদের হস্তান্তরিত কর্মকর্তা হবেন না।
কমিশন প্রধান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “সুপারিশগুলো বাস্তবায়নযোগ্য। এগুলো বাস্তবায়িত হলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে এবং তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে।”
গত বছরের ১৮ নভেম্বর অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদকে প্রধান করে আট সদস্যের এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় সরকার কাঠামোর আইনি, সাংগঠনিক এবং নির্বাচন পদ্ধতির অসমতা দূর করে একটি সমজাতীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
—
