ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক খাদের কিনারে, কাশ্মীর হামলার জেরে যুদ্ধের দামামা?


কাশ্মীরে ভয়াবহ পর্যটক হামলার পর পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের পারদ শুধু চড়ছেই না, রীতিমতো ফুটছে! ২৬ জনের রক্ত ঝরার বদলা নিতে ভারতের নেওয়া একগুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপের জবাবে পাকিস্তানও দিয়েছে তার চেয়েও কড়া পাল্টা জবাব। ভিসা বাতিল, আকাশপথ রুদ্ধ, বাণিজ্য বন্ধ থেকে শুরু করে স্নায়ুর লড়াই এখন পৌঁছেছে সিন্ধু নদীর পানি পর্যন্ত – যা নিয়ে ইসলামাবাদ সরাসরি ‘যুদ্ধের শামিল’ বলে হুমকি দেওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় ঘনিয়েছে সংঘাতের কালো মেঘ।

মঙ্গলবারের সেই রক্তাক্ত বিকেল ভোলার নয়। কাশ্মীরের নয়নাভিরাম বৈসারণ উপত্যকায় যখন পর্যটকদের ভিড়, তখনই অতর্কিত বন্দুক হামলায় ঝরে যায় ২৬টি প্রাণ, যাদের সিংহভাগই ভারতীয়। দায় স্বীকার করে স্বল্প পরিচিত টিআরএফ, যাদের পেছনে পাকিস্তানের মদদের অভিযোগ তুলেছে নয়াদিল্লি।

এরপরেই অগ্নিশর্মা ভারত। বুধবারই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নামানো হয় শাস্তির খড়্গ। বাতিল হয় সমস্ত পাকিস্তানি ভিসা, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়ার চরমপত্র। বন্ধ করে দেওয়া হয় আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত, বহিষ্কার করা হয় পাক সামরিক উপদেষ্টাদের, কমিয়ে আনা হয় দূতাবাসের কর্মী সংখ্যা। কিন্তু সবচেয়ে বড় বোমাটি ছিল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা – যা দুই দেশের মধ্যে ছয় দশক ধরে বয়ে চলা নদীর পানি বণ্টনের ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী মোদি আরও একধাপ এগিয়ে বিহারের জনসভায় হুঙ্কার দেন, হামলাকারী ও তাদের প্রভুদের খুঁজে বের করে দেওয়া হবে ‘কল্পনাতীত’ শাস্তি, তাদের ভূমি মিশিয়ে দেওয়া হবে ধুলায়।

নয়াদিল্লির আঘাতে ইসলামাবাদ যে বসে থাকবে না, তা অনুমিতই ছিল। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক থেকে এল পাল্টা আঘাতের ঘোষণা, যা আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ভারতীয়দের ভিসা বাতিল (ব্যতিক্রম শুধু শিখ তীর্থযাত্রীরা), ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ, ভারতীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বহিষ্কার এবং দূতাবাস কর্মী কমানোর মতো প্রত্যাশিত পদক্ষেপের পাশাপাশি পাকিস্তান বন্ধ করে দেয় ভারতের জন্য নিজেদের আকাশসীমা, স্থগিত করে দ্বিপাক্ষিক ও ট্রানজিট বাণিজ্য।

কিন্তু সবচেয়ে বিস্ফোরক ঘোষণাটি আসে সিন্ধু চুক্তি নিয়ে। ভারত পানি আটকালে বা সরালে তা ‘যুদ্ধের শামিল’ হবে এবং পূর্ণ শক্তি দিয়ে তা মোকাবিলার হুমকি দেয় পাকিস্তান। শুধু তাই নয়, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান ও আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সিমলাসহ সমস্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্থগিত রাখার একতরফা ঘোষণাও দিয়ে বসে ইসলামাবাদ!

এই নজিরবিহীন পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু তলানিতেই পৌঁছায়নি, তৈরি হয়েছে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি। কাশ্মীরে চলছে নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান, এর মধ্যেই এক সেনাসদস্যের মৃত্যু আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে। ভারত একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশে টানতে চাইছে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরেও সর্বদলীয় বৈঠকে মিলেছে সন্ত্রাস দমনে সরকারকে পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সরাসরি ভারতকে ‘ছোটখাটো যুদ্ধ’ চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তা দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা ২০১৯ সালের পর এই পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছেন। সিন্ধু নদীর পানি নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, কাশ্মীর উপত্যকার রক্ত গড়িয়ে এখন কি সিন্ধুর জলও রক্তাক্ত হওয়ার অপেক্ষায়? পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের এই বিপজ্জনক স্নায়ুর লড়াই কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার।