
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে করিডোর দেওয়ার ‘নীতিগত সিদ্ধান্তে’ উদ্বেগ জানিয়েছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনে করছে, এর ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি বলেও মত দিয়েছে তারা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই করিডোরের কারণে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান করিডোর দেওয়ার বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন, কারণ এর সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি জড়িত থাকতে পারে। আর নবগঠিত এনসিপি বলেছে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ের পর রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে ওই অঞ্চল একরকম বিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় সেখানে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। গত মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রাখাইনে জরুরি সহায়তা পাঠাতে একটি মানবিক করিডোর সৃষ্টির আহ্বান জানান।
এরপর গত ৮ এপ্রিল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান জানান, জাতিসংঘ এই করিডোর চেয়েছে। পরবর্তীতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন, জাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে শর্তসাপেক্ষে করিডোর দেওয়ার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় সোমবার ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, “সরকার এককভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি ঠিক হয়নি। এটি অনেক বড় সিদ্ধান্ত। তাদের উচিত ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। কারণ এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতা জড়িত।”
গাজায় মানবিক সহায়তার জন্য করিডোর দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “মানবিকতা থাকা ভালো। কিন্তু আজ বাংলাদেশকে ওই জায়গায় পৌঁছাতে হলো যে, আরেকটি দেশকে প্যাসেজ দিতে হচ্ছে। আমরা গাজায় পরিণত হতে চাই না, আমরা আরেকটা যুদ্ধের মধ্যে জড়াতে চাই না। বাংলাদেশে এসে কেউ গোলমাল করুক এটিও চাই না। একে তো আমরা রোহিঙ্গা নিয়ে বড় সমস্যায় আছি, তার ওপর প্যাসেজ দেওয়া নিয়ে যাতে সমস্যার সৃষ্টি না হয়, এ জন্য আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল।”
এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সোমবার সন্ধ্যায় তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লেখেন, “রাখাইনের সাথে মানবিক করিডোরের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ, এর সঙ্গে অনেক নিরাপত্তা বিষয় জড়িত থাকতে পারে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “গণঅভ্যুত্থানের একটি আকাঙ্ক্ষা হলো পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোনো সরকার চাইলেই নিজেদের মতো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে অবশ্যই রাজনৈতিক দল ও জনমতের প্রতিফলন ঘটে এমন সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
রোহিঙ্গা রাষ্ট্র নিয়ে জামায়াতের ব্যাখ্যা
এদিকে, রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রোহিঙ্গাদের জন্য আরাকানে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়ার দুই দিনের মাথায় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে জামায়াত। গত রোববার ঢাকায় সফররত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়।
ডা. তাহের সে সময় বলেছিলেন, জামায়াত আরাকানে রোহিঙ্গা সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে এবং চীনা প্রতিনিধিরা বিষয়টি বেইজিংকে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
তবে সোমবার ডা. তাহের অবস্থান পাল্টে বলেন, “মূলত বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছি। এটিই জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি।”
