
প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহ আসে কেবল আনুষ্ঠানিকতার ডালি সাজিয়ে নয়, বরং দেশের অতন্দ্র প্রহরী, আমাদের নিরাপত্তা রক্ষকদের হৃদয়ের কথা শোনার এক বিরল সুযোগ তৈরি করে। এবছরের পুলিশ সপ্তাহ সেই সুযোগকে আরও প্রসারিত করেছে, উন্মোচিত করেছে বাহিনীর সদস্যদের বহু দিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার কথা, তুলে ধরেছে তাদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া এবং একটি আধুনিক, পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বিদ্যমান অন্তরায়গুলো।
দেশের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, যখন একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর পুলিশ বাহিনীর অপরিহার্যতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, তখন তাদের উত্থাপিত দাবিগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা এবং পূরণের পথে আন্তরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব।
একুশে পত্রিকা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, পুলিশের এই দাবিগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বিষয় নয়; এগুলো একটি শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং সেবার মানসিকতায় পরিপূর্ণ পুলিশ বাহিনী গঠনের পূর্বশর্ত, যা প্রকারান্তরে দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সাথেই জড়িত।
নিরাপত্তার কারিগরদের অবর্ণনীয় ত্যাগ: চাই ন্যায্য স্বীকৃতি
আসুন, আমরা একবার চোখ বন্ধ করে ভাবি সেই পুলিশ সদস্যটির কথা, যিনি উৎসবের দিনেও পরিবার ছেড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। ভাবি সেই কর্মকর্তার কথা, যিনি দিন শেষে ৮ ঘণ্টার বদলে ১৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন শেষেও পরের দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখেন।
কনস্টেবল সামিয়া ইসলাম স্বর্ণা যখন পুলিশ সপ্তাহের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মতো বছরে ১২৯ দিন ছুটি তাদের কাছে স্বপ্নের মতো, যখন তিনি দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টার অমানুষিক শ্রম ও তার ফলে সৃষ্ট শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক চাপের কথা তুলে ধরেন – তখন তা নিছক কোনো পরিসংখ্যান থাকে না, তা হয়ে ওঠে লক্ষাধিক সদস্যের এক জীবন্ত বাস্তবতা।
এই চরম বাস্তবতার নিরিখে, বছরে প্রাপ্য ছুটির বিপরীতে অন্তত এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ ভাতার দাবিটি শুধু যৌক্তিকই নয়, এটি তাদের সীমাহীন ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রতি সামান্যতম সম্মান প্রদর্শন। এই স্বীকৃতিটুকু পেলে তাদের কর্মস্পৃহা যে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, পেশার প্রতি তাদের ভালোবাসা যে আরও গভীর হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি কোনো করুণা নয়, এটি তাদের অধিকার, যা তাদের মনোবলকে সুদৃঢ় করবে।

প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্বের আকুতি: চাই স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশন
সবচেয়ে আশার কথা হলো, পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকেই আজ আওয়াজ উঠেছে সকল প্রকার অযাচিত প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার। এএসপি মো. আল আসাদের মতো তরুণ কর্মকর্তারা যখন দৃঢ়তার সাথে বলেন, তারা আর ‘দলীয় পুলিশ’ নয়, বরং জনগণের ‘নতুন বাংলাদেশের পুলিশ’ হতে চান, তখন তা আমাদের আশাবাদী করে তোলে।
এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ দিতেই প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘পুলিশ কমিশন’। যে কমিশন নিশ্চিত করবে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন। যে কমিশন পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করবে অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব থেকে, তাদের কাজ করার জন্য একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।
জেলার পুলিশ সুপাররা যখন অকপটে স্বীকার করেন যে, ওসিদের পদায়নে রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়, তখন এই কমিশনের প্রয়োজনীয়তা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই যখন এই রক্ষাকবচ চাইছেন, তখন রাষ্ট্রের উচিত কালবিলম্ব না করে এটি গঠন করা, যাতে তারা সত্যিকার অর্থেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে, সংবিধান ও আইনের প্রতি অনুগত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চাই আধুনিক হাতিয়ার ও সক্ষমতা
অপরাধ জগতের ধরন প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে সাইবার অপরাধ আজ এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুলিশের হাতেও থাকা চাই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত জ্ঞান। একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী ‘সাইবার ইউনিট’ প্রতিষ্ঠার দাবিটি তাই বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এটি কেবল অপরাধ দমনেই নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাতেও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
একইভাবে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড বা অন্যান্য কারণে যে হাজার হাজার অজ্ঞাত লাশ বা অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে, সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল বরাদ্দ করা অপরিহার্য। এটি একদিকে যেমন তদন্ত প্রক্রিয়াকে গতিশীল করবে, অন্যদিকে মানবিক মর্যাদাও সমুন্নত রাখবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ, বিশেষত মানব পাচারের মতো ভয়াবহ সমস্যা মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে, যেমন লিবিয়ায়, বাংলাদেশ দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগের প্রস্তাবনাটিও অত্যন্ত দূরদর্শী। এটি বিদেশে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশী নাগরিকদের সুরক্ষা ও অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
ঝুঁকির মুখে যারা, তাদের স্বাস্থ্যসেবা হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
যারা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের রক্ষা করেন, তাদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষিত থাকতে পারে না। পুলিশের বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। পাশাপাশি, রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালকে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের যে দাবি উত্থাপিত হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। এটি বাস্তবায়িত হলে পুলিশ সদস্যরা দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসা সুবিধা পাবেন, যা তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মনে নিরাপত্তা ও স্বস্তির অনুভূতি দেবে। একটি সুস্থ ও সুরক্ষিত পুলিশ বাহিনীই পারে জাতিকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে।

দীর্ঘ সেবার প্রাপ্য সম্মান: সুপারনিউমারারি পদোন্নতি হোক বাস্তব
একজন পুলিশ সদস্য তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো উৎসর্গ করেন দেশ ও দশের সেবায়। কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদে উন্নীত হতে বা একই পদে বছরের পর বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে করতে তারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছান। এই দীর্ঘ ও নিবেদিতপ্রাণ সেবার স্বীকৃতি হিসেবে অবসরকালে উচ্চতর ধাপে সুপারনিউমারারি পদোন্নতির দাবিটি অত্যন্ত মানবিক ও যৌক্তিক। এটি কেবল আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করবে তাই নয়, বরং কর্মজীবনের শেষ দিনগুলোতে তাদের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদাকে সমুন্নত রাখবে। এই পদক্ষেপটি বাহিনীর সকল স্তরের সদস্যদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পেশার প্রতি আকর্ষণ বাড়াবে।
পুলিশের চাওয়া পূরণেই নিহিত দেশের মঙ্গল
পুলিশ সপ্তাহের মঞ্চ থেকে উঠে আসা এই দাবিগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো চাওয়া-পাওয়া নয়। এগুলো একটি আধুনিক, দক্ষ, মানবিক, আত্মবিশ্বাসী এবং সর্বোপরি পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য সোপান। প্রধান উপদেষ্টা এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক যখন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার উপর জোর দিচ্ছেন, তখন এই দাবিগুলো পূরণের মাধ্যমেই সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, পুলিশের এই যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিগুলোকে সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করুন, এগুলোকে অগ্রাধিকার দিন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
মনে রাখতে হবে, পুলিশের উন্নয়ন মানে কেবল একটি বাহিনীর উন্নয়ন নয়, এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার উন্নয়ন, নাগরিকের নিরাপত্তার উন্নয়ন। পুলিশের মনোবল উন্নত হলে, তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হলে, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হলে, তারাই হয়ে উঠবেন ‘নতুন বাংলাদেশের’ স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি। আমাদের নিরাপত্তা রক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, তাদের মুখে হাসি ফুটুক – এই হোক আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
