মহেশখালীর ধলঘাটায় ড্রেজিংয়ের আড়ালে বালু লুট, ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধ


কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটায় বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ড্রেজিং প্রকল্পের আড়ালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা সরওয়ার আলম শাহীনের নেতৃত্বে ওয়েস্টার্ন গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ, যা এলাকার বেড়িবাঁধ ও পরিবেশকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের অভিযোগে জানা যায়, বিএনপি নেতা সরওয়ার আলম শাহীন, ধলঘাটার দুইজন ইউপি সদস্যের যোগসাজশে ওয়েস্টার্ন গ্রুপ এই বালু উত্তোলন ও বিক্রির কাজ করছে। সরওয়ার শাহীন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এবং ওয়েস্টার্ন গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ বশির ও সিইও রাশেদুল হক মিঠুর সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ।

মাতারবাড়ি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের শেষ প্রান্তে, ধলঘাটা ইউনিয়নের হামিদখালী সরইতলী এলাকায় ওয়েস্টার্ন গ্রুপ প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ও ২৫ ফুট উঁচু বালির বাঁধ তৈরি করেছে। অথচ এই এলাকাটি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও জেলা প্রশাসনের বালিয়াড়ি চর হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে খনন বা বাঁধ নির্মাণে বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন, যা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জমির মালিকদের অনুমতি না নিয়ে, কোথাও ভুয়া মালিকানা দেখিয়ে চুক্তি করে এবং জনমত উপেক্ষা করে এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এমনকি আইনত খনন নিষিদ্ধ এমন এলাকাতেও ড্রেজার বসানো হয়েছে এবং কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি।

এই কর্মকাণ্ডের ফলে ধলঘাটার পরিবেশগত ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পাইপ বসানোর কারণে ইতোমধ্যে বাঁধের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধ ভেঙে গিয়ে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হতে পারে, যা হাজারো পরিবারকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।

এলাকাবাসী জানান, এর আগেও ধলঘাটায় বালু উত্তোলন নিয়ে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এবারও প্রশাসন অনেকটা ‘নীরব দর্শক’ বলে মনে করছেন তারা।

ওয়েস্টার্ন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাশেদুল হক মিঠু পাইপের কারণে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মেরামত করার কথা বললেও, ক্ষতির আগে কেন সতর্কতা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সরওয়ার আলম শাহীন ওয়েস্টার্ন গ্রুপ বা এই প্রকল্পের সঙ্গে বর্তমানে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন। যদিও প্রকল্পের দায়িত্ব তিনি পালন করছেন বলে ওয়েস্টার্ন গ্রুপের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। মূলত ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দের ১২ মিটার গভীরতার এই ড্রেজিং প্রকল্পটিকে সামনে রেখেই বালু উত্তোলনের কাজ চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জামাল মুর্শিদ বলেন, বেড়িবাঁধ ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত করে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অভিযান চালানো হবে। তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া খনন ও পরিবেশ ধ্বংসের দায়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধানের কথা উল্লেখ করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক জমির উদ্দীন জানান, পানি আইন ২০১৩ অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণ হলে অর্থ ও কারাদণ্ড হতে পারে। উপজেলা প্রশাসন চাইলে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য পাউবো ও প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হেদায়েত উল্লাহ বলেন, বেড়িবাঁধের বিষয়টি পাউবো দেখবে। তবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দিন জানিয়েছেন, পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সিইএইচআরডিএফ-এর উপপ্রধান ও পরিবেশ কর্মী আব্দুল মান্নান রানা বলেন, “এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে ধলঘাটার পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে হাজারো পরিবার বিপদের মুখে পড়বে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ দুর্যোগ অবশ্যম্ভাবী।”