চামড়া শিল্প: অর্ধেক চামড়া অবিক্রিত, ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না মালিকরা


কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি চালু না করেই ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর এবং последу সরকারি সহায়তার অভাবেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চামড়া শিল্প এখন ধুঁকছে বলে অভিযোগ করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

তারা বলছেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিশেষ করে কার্যকর সিইটিপি নিশ্চিত না করেই ট্যানারি স্থানান্তরে বাধ্য করায় বেশিরভাগ কারখানা আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মান অর্জন করতে পারছে না। ফলে মিলছে না লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ, যা উন্নত বিশ্বে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির জন্য অপরিহার্য। এতে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি चीनর মতো ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতির কারণে গত বছরের প্রায় ৩০ লাখ পিস চামড়া এখনও গুদামে অবিক্রিত পড়ে আছে, যা মোট মজুদের অর্ধেকেরও বেশি। অব্যাহত লোকসানের মুখে প্রায় ৯০ শতাংশ ট্যানারি মালিক ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন। খাতটিকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা এবং ঋণ পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের সময় নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর সিইটিপি নির্মাণ বা শিল্প সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর ব্যর্থতার কারণেই চামড়া নগরী প্রকল্প সফল হয়নি বলে তারা মনে করেন।

লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদপ্রাপ্ত মাত্র পাঁচটি ট্যানারি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের সুবিধা নিতে পারছে। বাকিরা কমপ্লায়েন্সের অভাবে মূলত চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজার দরের চেয়ে ৭০-৮০ শতাংশ কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন। তিনি খাতটিকে ‘আইসিইউতে’ থাকা অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তার ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ জানান, চীনের বাজারেও এখন সমস্যা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ক্রেতারা দাম আরও ১০-২০ শতাংশ কমানোর চাপ দিতে পারে। এছাড়া সম্প্রতি লবণের দাম বৃদ্ধি এবং গরমে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, এ খাতের উদ্যোক্তারা ঋণের জালে জর্জরিত। কোরবানির সময় চামড়া কেনার জন্য প্রয়োজনীয় ৩০০-৪০০ কোটি টাকার জোগান পেতে সরকারি সহায়তা অপরিহার্য। তিনি ঋণ পরিশোধে দীর্ঘমেয়াদি সময় এবং শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন ঋণ সহায়তার দাবি জানান।

পরিস্থিতির জন্য পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে দায়ী করছেন অনেকে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এসব নীতির কারণে প্রতিবেশী ভারতের চামড়া শিল্পের সুবিধা হয়েছে।

এদিকে, সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর সিইটিপির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা থাকলেও কোরবানির সময় অতিরিক্ত বর্জ্যের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। গত বছর চাপ নিয়ন্ত্রণে রেশনিং করে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করেও দূষণ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। পরিশোধিত বর্জ্যে ক্লোরাইড ও বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) নির্ধারিত সীমার মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে কাঁচা চামড়ার দামেও চলছে ব্যাপক দরপতন। ২০১৫-১৬ সালে যেখানে একটি গরুর চামড়া গড়ে দুই হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হতো, সেখানে গত বছর কোরবানির ঈদে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৮০০-৯০০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে আরও কম দামে বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া অনেক স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ বছর প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ লাখ বেশি।