- চট্টগ্রামে নিজ কার্যালয় থেকে সহকারী পরিচালক (এএসপি) পলাশ সাহার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় সেখানে একটি ‘সুইসাইড নোট’ পাওয়া যায়। ছবি: সংগৃহীত
আবারও একটি আত্মহননের খবর আমাদের ব্যথিত করেছে। পুলিশের এক তরুণ কর্মকর্তা নিজের কার্যালয়েই জীবনের ইতি টেনেছেন। টেবিলের ওপর পাওয়া চিরকুট হয়তো তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক টানাপোড়েনের দিকে ইঙ্গিত করছে। কিন্তু আমরা মনে করি, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, দেশসেবায় ব্রতী পুলিশ সদস্য যখন এমন একটি চূড়ান্ত ও মর্মান্তিক পথ বেছে নেন, তখন তার পেছনের কারণগুলোকে শুধুমাত্র ‘পারিবারিক কলহ’ বা ‘ব্যক্তিগত হতাশা’র মোড়কে আবদ্ধ করে ফেলাটা সমস্যার অতি সরলীকরণ। এর গভীরে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পুলিশ ব্যবস্থার নিজস্ব দায় ও দুর্বলতাগুলোকেও বিশ্লেষণ করা অত্যাবশ্যক।
পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রায়শই মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের অসহনীয় পরিবেশ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা অথবা পারিবারিক সমস্যাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই কারণগুলো তো উপসর্গ মাত্র। আমি মনে করি, এই উপসর্গগুলোর মূল কোথায়, সেই অনুসন্ধান জরুরি। কেন আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এমন অসহায়ত্বের শিকার হচ্ছেন, যেখানে আত্মহননকেই তারা মুক্তির পথ বলে ধরে নিচ্ছেন?
মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার বা তাদের সমস্যাগুলো অনুধাবন করার সুযোগ সাধারণ মানুষের কম। কিন্তু আমরা যতটুকু জেনেছি, তাতে কিছু কাঠামোগত বিষয় স্পষ্টতই তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, কনস্টেবল বা সাব-ইন্সপেক্টর পদে যোগদানের ক্ষেত্রে ‘অবিবাহিত’ থাকার যে শর্ত, তা আধুনিক যুগে কতটা প্রাসঙ্গিক, সেই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। চাকরি স্থায়ী না হওয়া পর্যন্ত বা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিয়ে করতে না পারার এই বাধ্যবাধকতা অনেক তরুণ পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর সংকট তৈরি করে। ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা, সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করা এবং একইসঙ্গে চাকরির অনিশ্চয়তা ও প্রশিক্ষণের কঠোর জীবন—এই ত্রিবিধ চাপ অনেক সময়ই তাদের সহ্যশক্তির বাইরে চলে যায়। এর ফলে যে মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়, তা থেকে আত্মরক্ষার পথ না পেয়ে কেউ কেউ হয়তো জীবনের প্রতিই বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েন। বিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকারের অংশ। রাষ্ট্রের কোনো চাকরিতে এই অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে রাখার পেছনে যে যুক্তিই থাকুক না কেন, তার প্রায়োগিক উপযোগিতা এবং কর্মীদের ওপর তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে বিশদ গবেষণা ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সারা পৃথিবীতেই পুলিশের চাকরি একটি উচ্চ-চাপযুক্ত পেশা হিসেবে স্বীকৃত। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চাপের মাত্রা এবং তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পুলিশ আইনে তাদের ২৪ ঘণ্টার ডিউটির কথা বলা আছে, কিন্তু বাস্তবে এই ‘২৪ ঘণ্টা’ অনেকের জীবনে বিশ্রামহীন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। শুধু দীর্ঘ কর্মঘণ্টাই নয়, ডিউটির অনিশ্চয়তাও একটি বড় সমস্যা। বেশিরভাগ পুলিশ সদস্যই জানেন না, পরদিন তার ডিউটি কোথায় বা কখন শেষ হবে। ফলে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, এমনকি নিজের বিশ্রাম বা বিনোদনের জন্যেও তারা কোনো পরিকল্পনা করতে পারেন না। এই অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। উৎসব-পার্বণে, যখন প্রতিটি মানুষ তার প্রিয়জনের সান্নিধ্য চায়, তখনও আমাদের পুলিশ সদস্যদের সিংহভাগই রাজপথে বা কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন। কারণ, অপরাধ বা দুর্ঘটনা তো ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে আসে না। এর ফলে স্ত্রী-সন্তান, পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তাদের যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, তা একসময় তাদের একাকিত্ব ও হতাশায় নিমজ্জিত করে। তারা নিজেদের অজান্তেই পরিবার ও সমাজ থেকে ক্রমশ দূরে সরতে থাকেন।
অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা পুলিশ সদস্যদের মানসিক পীড়নের কারণ হয়। কথায় কথায় বদলি, তুচ্ছ কারণে কঠোর শাস্তি, অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই ‘ক্লোজড’ করে দেওয়া—এগুলো যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। তদন্তের নিরপেক্ষতার স্বার্থে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও যখন একজন সদস্যকে তার পূর্বের সম্মানজনক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয় না, তখন তা তার মনোবল ভেঙে দেয়। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পুলিশের শাস্তির হার প্রায় ১২৭ শতাংশ! এই পরিসংখ্যান আমাদের আতঙ্কিত করে। প্রশ্ন জাগে, কেন এত বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য আইন বা নিয়ম ভাঙছেন? এর জন্য কি কেবল ব্যক্তি সদস্যরাই দায়ী, নাকি আমাদের ব্যবস্থার মধ্যেই এমন কোনো ত্রুটি রয়েছে যা তাদের আইন মানতে নিরুৎসাহিত করছে বা বাধ্য করছে নিয়ম ভাঙতে? এই মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত না করে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায় না।
সম্প্রতি পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল আরও উদ্বেগজনক। সেখানে অংশগ্রহণকারী ৯৮ শতাংশ সদস্যই জানিয়েছেন যে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা কোনো না কোনো ধরনের মানসিক চাপে ভোগেন। ৯১ শতাংশ সদস্য মনে করেন, পরিবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে না পারা তাদের মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। ৮৩ শতাংশ সদস্যের রাতে ঘুমের সমস্যা হয় এবং সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, ৯৫ শতাংশ সদস্যই মনে করেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাউন্সেলিং বা পেশাগত সহায়তা প্রয়োজন।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পুলিশ সদস্যরাও এই সমাজেরই অংশ, তারাও রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদেরও ক্লান্তি আছে, আবেগ আছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন আছে। কিন্তু বিদ্যমান আইন, সেকেলে প্রশাসনিক কাঠামো এবং আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা অনেক সময় এই মানবিক দিকটিকে উপেক্ষা করে যায়। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে আমরা যেমন দ্রুত পুলিশকে দোষারোপ করি, তেমনি তাদের ভেতরের সমস্যাগুলো জানা, সেগুলোর প্রতি সংবেদনশীল হওয়া এবং তার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাও রাষ্ট্রের এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। একটি সুস্থ, সবল ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল পুলিশ বাহিনী ছাড়া একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, ‘শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে’। অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠান তার সদস্যদের প্রতি যত্নশীল ও সহানুভূতিশীল হতে পারে, সেই প্রতিষ্ঠানই তার সদস্যদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও সেবা আশা করতে পারে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।

