জনপ্রতিনিধি হয়েও অটো চালিয়ে জীবন, মানুষের সেবায় সুজনের স্টিয়ারিংয়েই ভরসা

কক্সবাজারের মহেশখালীর ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের গ্রামীণ পথে যখন দিনের ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যা নামে, তখনও অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে ছুটে চলেন একজন জনপ্রতিনিধি – সুজন কান্তি দে। তিনি শুধু ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্যই নন, স্থানীয়দের কাছে তিনি এক ভরসার নাম, আপদে-বিপদে নিবেদিতপ্রাণ এক সেবক, যিনি নিজের জীবনসংগ্রাম আর জনপ্রতিনিধিত্বকে এক সুতোয় গেঁথেছেন সততার সঙ্গে।

তরুণ বয়সে জীবিকার তাগিদে যে অটোরিকশার স্টিয়ারিং ধরেছিলেন সুজন, জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও তা ছাড়েননি। পেশা আর সেবাকে তিনি মিলিয়ে নিয়েছেন অদ্ভুত দক্ষতায়। প্রতিদিন নিয়ম করে অটোরিকশা নিয়ে বের হন, যাত্রী পরিবহন করেন। আবার সেই অটোরিকশাতেই অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ান, কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো জরুরি প্রয়োজনে সাড়া দেন গভীর রাতেও। চালকের আসনে থেকেও তিনি যেন নীরবে বসে আছেন মানুষের হৃদয়ের আসনে।

“সুজন শুধু একজন চালক বা মেম্বার নন, তিনি একজন খাঁটি ‘মানুষের মতো মানুষ’,” এভাবেই স্থানীয়রা বর্ণনা করেন তাদের প্রিয় জনপ্রতিনিধিকে। তারা বলেন, “কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে ছুটে যান সুজন। তার আচার-আচরণ, সততা আর সাধারণ জীবনযাপন আমাদের অনুপ্রাণিত করে।”

তবে এমন নিবেদিত সেবা আর জনপ্রিয়তার পথেও কাঁটা ছড়ায় নিন্দুকের কথা। “ইউপি সদস্য হয়ে কেন অটো চালান?” – এমন প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় তাকে প্রায়শই। কিন্তু এসবে কান দেওয়ার পাত্র নন সুজন। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে তিনি বলেন, “সৎ পথে থেকে পরিশ্রম করে উপার্জন করি, এতে লজ্জার কিছু নেই। মানুষের সেবা করতে পারাটাই আমার কাছে মুখ্য। অটোরিকশা চালিয়ে হলেও পরিবার চালাই, কারও কাছে মাথা নিচু করতে হয় না।”

স্বামীর এই দৃঢ়তায় গর্বিত স্ত্রী শিল্পী মল্লিক। তিনি বলেন, “মানুষের জন্য তিনি যা করেন, যেভাবে সৎ জীবনযাপন করেন, তাতে আমি গর্বিত। দুয়েকজন কটু কথা বললেও আমরা সেগুলো গায়ে মাখি না। তার প্রতিটি ভালো কাজেই আমার আনন্দ।”

জনসেবার এই ব্রত সুজনের হৃদয়ে গেঁথেছিল এক তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। বহু বছর আগে, অটোরিকশা সংক্রান্ত একটি কাজে তৎকালীন এক ইউপি সদস্যের স্বাক্ষরের জন্য গিয়ে বারবার ঘুরেও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন তিনি। সেদিনকার সেই অপমান আর অসহায়ত্বই তাকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছিল। মনে মনে সেদিনই ঠিক করেছিলেন, সুযোগ পেলে সাধারণ মানুষের এমন দুর্ভোগ আর হতে দেবেন না।

সেই প্রত্যয় থেকেই পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রার্থী হন সুজন কান্তি দে। ব্যালট নয়, তিনি চেয়েছিলেন মানুষের ‘ভরসা’। ফলও পেয়েছিলেন হাতেনাতে – প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর সম্মিলিত ভোটের চেয়েও প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। চালকের আসন থেকে উঠে আসা জনতার এই প্রতিনিধিকে মানুষ আপন করে নিয়েছিল তাদের সেবক হিসেবে।

অতীতে স্বাক্ষর না পাওয়ার সেই যন্ত্রণা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় সুজনকে। তাইতো নিজের ওয়ার্ডের মানুষের জন্য তিনি যেন এক ‘চলমান সেবা কেন্দ্র’। যেকোনো প্রয়োজনে, এমনকি চলতি পথেও মানুষ তার অটোরিকশা থামিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে পারে।

অটোরিকশাচালক এই ইউপি সদস্যের নিষ্ঠা, সততা আর নিঃস্বার্থ জনসেবা আজ মহেশখালীর সীমানা ছাড়িয়ে অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প। তার অনাড়ম্বর জীবন আর সেবার মানসিকতা নিয়ে স্থানীয়রা প্রায়ই বলেন, “সুজনের মতো মানুষেরা যদি দেশের সবখানে রাজনীতি করতো, তাহলে রাজনীতি সত্যিই হয়ে উঠত মানবকল্যাণের আরেক নাম।”