
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানো ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে ‘ঢাকাবাসী’র ব্যানারে টানা ছয় দিনের আন্দোলন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে চলমান ছাত্রদলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নানা দাবি অন্তর্বর্তী সরকার মেনে নিলেও, বিএনপির সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সরকারের অবস্থান কী হয়, সেদিকেই বিশেষভাবে নজর রাখছে দলটি। এই দুই ইস্যুকে নিজেদের জন্য ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে দেখছে বিএনপি।
সোমবার (১৯ মে) রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার সময় এই পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নেতারা মনে করছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা তাদের সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠনের দাবি-দাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার তুলনামূলক সহজে মেনে নিয়েছে। এমনকি যমুনা ঘেরাওসহ রাজধানীর রাজপথে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে অনেকেই তাদের দাবি আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও অস্পষ্ট। বিশেষত, আদালতের রায় থাকার পরও ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে শপথ না পড়ানোর কারণ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় বৈঠকে। একইসাথে, ছাত্রদল নেতা সাম্য হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের তৎপরতাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “এখনও পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাধারণ মানুষ (ইশরাকের স্বপক্ষে) এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরাও (বিএনপি) এ আন্দোলন সমর্থন করছি। সাধারণ মানুষের আন্দোলনের একটা পর্যায়ে অবশ্যই আমাদের সক্রিয়ভাবে দলগতভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে, যদি সরকারের টনক না নড়ে।” ইশরাককে শপথ পড়ানোর দাবিতে সংবাদ সম্মেলনসহ নানা পদক্ষেপের পরও দাবি আদায় না হওয়ায় প্রয়োজনে দলীয়ভাবে কঠোর আন্দোলনে নামার ইঙ্গিত দেন তিনি।
বৈঠকে আসন্ন “জুলাই সনদ” ঘোষণা এবং এ সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনা গুরুত্ব পায়। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জাতীয় সনদ ইস্যুতে গণভোটের দাবি এবং নতুন সংবিধানের আলোচনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপি নেতারা। এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার ভাষায়, “সরকার বলছে তারা সংস্কার করবে, সেখানে সংবিধানে সবার মতামতে সংস্কার আনা যায়। কেন নতুন সংবিধান লেখার প্রশ্ন আসবে? মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের যে স্বাধীন দেশ ও সংবিধান পেলাম, এর কী হবে?”
নেতারা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করে কেবল “সংস্কার আর সংস্কার” নিয়ে কথা বলছে। “জুলাই সনদ” কেন্দ্র করে দেশে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছে বিএনপি, যা মোকাবিলা করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বৈঠকে সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল এবং সেক্ষেত্রে প্রশাসনের তুলনামূলক নমনীয় মনোভাবকে “ভয়ংকর বার্তা” হিসেবে অভিহিত করা হয়। নেতারা মনে করেন, “জুলাই সনদ” নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবর্তে বিভক্তি বাড়ছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। আর এই সরকারের ব্যর্থতা মানে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সবার ব্যর্থতা। তাই সরকারকে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য করতে বিএনপি কী ধরনের কর্মসূচি দিতে পারে, সে বিষয়ে নেতাদের ভাবতে বলা হয়েছে। পরবর্তী স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা রয়েছে।
দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সারাদেশে সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে বিএনপি। সম্প্রতি, এই সদস্য সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ‘আওয়ামী লীগের ভালো নেতাকর্মী’কে বিএনপিতে স্বাগত জানানো সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট দলীয় গাইডলাইন থাকা উচিত বলে মনে করেন নেতারা। বৈঠকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিভিন্ন ইস্যুতে দেওয়া বক্তব্য সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে এবং তাঁর নির্দেশনাই দলের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে সকলে একমত পোষণ করেন। তবে এ বিষয়ে তারেক রহমান কোনো মন্তব্য করেননি।
এছাড়াও, দলের আংশিক কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করা এবং সদস্য সংগ্রহ অভিযানে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অরাজনৈতিক ছাত্র-জনতাকে দলে টানতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমন্ত্রণ জানানোর পক্ষেও মতামত আসে।
