তামাকের ছোবল: প্রতিদিন ৪৪২ মৃত্যু, নিয়ন্ত্রণে পিছিয়ে বাংলাদেশ


তামাক ও নিকোটিন কোম্পানিগুলো তাদের ক্ষতিকর পণ্য তরুণ প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে যে ধরনের অপকৌশল অবলম্বন করে, তা উন্মোচনের লক্ষ্যে আজ (শনিবার) পালিত হচ্ছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘আনমাস্কিং দি অ্যাপিল : এক্সপোজিং ইন্ডাস্ট্রি ট্যাক্টিকস অন টোব্যাকো অ্যান্ড নিকোটিন প্রোডাক্টস’।

বাংলাদেশে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা-মানস তামাকের ভয়াবহতা ও এর নিয়ন্ত্রণে করণীয় তুলে ধরেছে।

প্রজ্ঞা ‘গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭’-এর তথ্য দিয়ে জানায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব) তামাক ব্যবহার করেন। ৩ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ ধূমপান না করেও গণপরিবহন ও পাবলিক প্লেসে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। ১৩-১৫ বছর বয়সীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার ৭ শতাংশ। ‘টোব্যাকো এটলাস ২০১৮’ অনুযায়ী, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ অকালে মারা যান, অর্থাৎ প্রতিদিন ৪৪২ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধূমপানমুক্ত পরিবেশ ও তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও সর্বোত্তম মান অর্জন করতে পারেনি। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত সংশোধনী পাস হলে বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মানসের সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, “মুনাফালোভী তামাক কোম্পানিগুলো নানা অপকৌশলে তাদের মৃত্যুপণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণে মরিয়া। তাদের প্রধান টার্গেট শিশু-কিশোর ও তরুণরা।” তিনি অভিযোগ করেন, কোম্পানিগুলো আইন না মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে এবং তরুণদের আনাগোনা বেশি এমন রেস্টুরেন্টে ‘ধূমপানের স্থান’ তৈরি করে নেশার ফাঁদ পাতছে।

মানসের তথ্যে আরও উঠে এসেছে, সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রে ও ওয়েব সিরিজে ধূমপান ও মাদক সেবনের দৃশ্য উদ্বেগজনকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা তরুণদের উৎসাহিত করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার ৩০ শতাংশ কমানোর কথা থাকলেও এক্ষেত্রে দেশ অনেক পিছিয়ে (২০১০ সালে ৪৩.৩% থেকে বর্তমানে ৩৫.৩%)।

প্রজ্ঞা ও মানসের প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে:
* সকল পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহন শতভাগ ধূমপানমুক্ত করা।
* তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন, বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং কোম্পানির সিএসআর কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
* শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ এবং বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধ করা।
* ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসহ (এইচটিপি) সব ধরনের ইমার্জিং টোব্যাকো ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করা।
* তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৯০ শতাংশ করা।

প্রজ্ঞা মনে করে, প্রস্তাবিত তামাক সংশোধিত আইন পাস হলে তামাকের ব্যবহার কমবে এবং বছরে তামাকজনিত রোগ ও উৎপাদনশীলতা হারানোর ৩০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। সংস্থাটি আরও জানায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তুলনায় সিগারেটের দাম তুলনামূলকভাবে কম বাড়ায় এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকছে, যা ব্যবহার হ্রাসে একটি বড় বাধা।

দিবসটি উপলক্ষে প্রজ্ঞা একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে এবং মানস শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভার আয়োজন করে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করছে।