
গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকার ২ লাখ ৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিয়েছে। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা এবং গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি খাতে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এই পাঁচ বছরের ব্যবধানে শুধু বিদ্যুতের ভর্তুকিই বেড়েছে প্রায় ৫৯৩ শতাংশ এবং সার্বিকভাবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বেড়েছে ৩১০ শতাংশ।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া ভুল মহাপরিকল্পনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপক হারে বাড়ানো হলেও জ্বালানি সরবরাহের দিকটি অবহেলিত রাখা এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির কারণেই এই বিপুল ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা, যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৬২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই ভর্তুকি বেড়েছে ৫৩ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। ২০১০ সালের বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি।
ফলে, উৎপাদন সক্ষমতা (২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট) বাড়ানো হলেও তার উল্লেখযোগ্য অংশ বসিয়ে রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৪ বছরে ৮২টি বেসরকারি ও ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে গ্যাস খাতেও ভর্তুকির পরিমাণ ব্যাপকহারে বেড়েছে, যার মূল কারণ ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকি ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের (৮ হাজার ২২০ কোটি টাকা) তুলনায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাতে ভর্তুকি ছিল ৫ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট গ্যাস সরবরাহে সংস্থাটির খরচ হচ্ছে ২৯ টাকা ৩৯ পয়সা, আর গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করা হচ্ছে ২২ টাকা ৮৭ পয়সা, যার ঘাটতি পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে অবহেলা এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোর কারণেই গ্যাস খাতে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহারের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “বিগত সময়ের বিপুল পরিমাণ বকেয়া অন্তর্বর্তী সরকার পরিশোধ করায় চলতি অর্থবছরের ভর্তুকির পরিমাণ বেশি দেখাচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুতে ভর্তুকি কমিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও কমে আসবে, কারণ এখন আর কোনো বকেয়া বা বিলম্ব মাশুল নেই।”
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, “বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর চেষ্টা নেই। বিগত সরকার বছরের পর বছর শুধু গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবর্তিত সরকারও গ্যাস-বিদ্যুতের লুণ্ঠনমূলক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ না নেওয়ায় এ খাতে ভর্তুকি বেড়েছে এবং এভাবে চলতে থাকলে তা আরও বাড়বে।”
পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্যাস খাতে অনুসন্ধান ও খননের বিভিন্ন পরামর্শ উপেক্ষা করে আমদানিনির্ভরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যার ফলে পেট্রোবাংলা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই বিপুল ভর্তুকির চাপ সামলাতে এবং জ্বালানি খাতে টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে বের করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
