নির্বাচন কবে: টালবাহানায় সময়ক্ষেপণ, না কি যৌক্তিক পরিকল্পনা?


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট ও দূরত্ব বাড়ছে। বিএনপি এবং আরও কয়েকটি দল চলতি বছরের (২০২৫) ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে অনড় থাকলেও, অন্তর্বর্তী সরকার এখন আগামী বছরের (২০২৬) জুনের মধ্যে ভোট আয়োজনের কথা বলছে। পূর্বে ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের একটি ধারণা দেওয়া হলেও, সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ‘ডিসেম্বর’ শব্দটি বাদ পড়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি ভোটের দাবিতে মাঠে নামারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার একজন সহকারী এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এমন একজন জ্যেষ্ঠ জামায়াত নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী বছর জুনের মধ্যে রমজান মাস এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মতো তিনটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকায় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক সময়সীমা ভাবা হচ্ছে। তারা রমজান মাসের আগে বা ঠিক পরে ভোটের একটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিএনপির চাপকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না এবং এ বিষয়ে তিনি উপদেষ্টা পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন পেয়েছেন। সরকার আশা করছে, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের সমর্থন দেবে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতা মনে করছেন, রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কার, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি – এই তিনটি ক্ষেত্রে গত ১০ মাসে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় নির্বাচন আরও পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রধান উপদেষ্টা ও তার সহযোগীরা মুখে সংস্কার ও নির্বাচনের কথা বললেও, ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। মিয়ানমারের রাখাইনের সঙ্গে ‘মানবিক করিডর’ চালু, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া, সরকারি চাকরিবিধি পরিবর্তন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণের মতো বহু বিষয় সামনে নিয়ে আসা হলেও নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা (রোডম্যাপ) না দেওয়ায় সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে বেশির ভাগ দলের মধ্যে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে।

এই বিরাজমান পরিস্থিতিতে দলের ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, “রোডম্যাপ ঘোষণা না করে সরকার যে টালবাহানা করছে, এ বিষয়টাকে আমরা ভালোভাবে দেখছি না। জনগণও ভালোভাবে নিচ্ছে না।” সরকার দ্রুত সময়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করে চলমান অস্থিরতা দূর করবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তা না হলে আমরা জনগণকে নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হব।”

নির্বাচন নিয়ে সরকার ও দলগুলোর মধ্যে এই বোঝাপড়ার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “এমনিতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের রেকর্ড নেই বললেই চলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, হয়তো এবারও আলোচনায় কোনো সমাধান আসবে না।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতে ইসলামীর একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ভোটের সময় নিয়ে মতভেদ ও অস্থিরতা দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। জামায়াত মনে করে, দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে বিএনপি এবং অন্যান্য জনসমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। এই পারস্পরিক দোষারোপ ও জেদের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক চরম তিক্ততার দিকে যাচ্ছে বলে অনেক নেতাই আশঙ্কা করছেন।