নতুন মুখের খোঁজে বিএনপি, বাদ পড়তে পারেন অনেক প্রভাবশালী নেতা

বিএনপি লোগো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একযোগে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেমেছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। একদিকে দেশব্যাপী আসনভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে নতুন ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করার এক সাবধানী প্রক্রিয়া শুরু করেছে দলটি, অন্যদিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে পুনর্গঠিত করে একটি শক্তিশালী কাঠামোয় দাঁড় করানোর এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দ্বিমুখী কৌশলকে আগামী নির্বাচনের জন্য বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

প্রার্থী বাছাইয়ে নতুন সমীকরণ: তারুণ্য, মেধা ও পরিচ্ছন্ন ইমেজ

আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে বিশ্বস্ত তিনজনের একটি দল দেশব্যাপী আসনভিত্তিক জরিপ পরিচালনা করছে। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত ইমেজ এবং এলাকায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করছেন। এই জরিপে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অপেক্ষাকৃত তরুণ, মেধাবী এবং সমাজে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে এমন নেতাদের।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, “পৃথিবী এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজ। রাজনীতি করতে হলে নেতাদের বিভিন্ন বিষয়ে আপডেট থাকতে হয়। তাই এবারের নির্বাচনে তরুণ, শিক্ষিত এবং জনপ্রিয়তা আছে—এমন অনেক নতুন মুখকে প্রার্থী হিসেবে দেখা যাবে।” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, এবারের মনোনয়নে বড় ধরনের চমক থাকতে পারে, যেখানে অনেক সিনিয়র ও প্রভাবশালী নেতাও বাদ পড়তে পারেন।

২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদেরও বিবেচনায় রাখা হলেও, দলটি ২০১৮ সালের মতো এক আসনে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়নের চিঠি দিয়ে আর কোনো বিভ্রান্তি তৈরি করতে চায় না। সালাউদ্দিন আহমদ নিশ্চিত করে বলেন, “এবার দলের সিদ্ধান্ত একক প্রার্থী নির্ধারণ করার। ২০১৮ সালের মতো একাধিক প্রার্থী হবে না।”

এই কৌশলের অংশ হিসেবে মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আসন ভাগাভাগির আলোচনা চলছে। জানা গেছে, মিত্র দলগুলোর বেশ কয়েকজন নেতাকে ইতোমধ্যে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় কাজ করার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর দুই-তিনটি আসন মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলে দলের সিনিয়র নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর, আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে।

দল পুনর্গঠন: তৃণমূলকে শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জ

প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি বিএনপি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে দল পুনর্গঠনের ওপর। গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে দলটি কার্যত কোনো সম্মেলন বা কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলের কমিটি গঠন করতে পারেনি। কেন্দ্র থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই কমিটি ঘোষণা করা হতো। ফরিদপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, “আগে ভিন্ন বাস্তবতা ছিল। এখন আমরা কর্মীদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে, কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করছি। সংগঠনে কর্মীদের ইচ্ছার প্রতিফলন থাকতে হবে, তাদের ভোটেই নেতৃত্ব তৈরি হতে হবে। এটাই আমাদের মূল স্পিরিট।”

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বরিশাল, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ সব বিভাগেই সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তবে এই পথচলা মোটেও মসৃণ নয়। উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিএনপি একটি বড় দল এবং এখানে পদের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র। কমিটিতে স্থান না পেলে অনেকের অনুসারীরা বিক্ষোভ করছেন, যা পরে অবশ্য সমাধানও করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, কমিটি গঠনে আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাদেরই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

তবে পুনর্গঠনের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেমন, বরিশাল বিভাগে গত জানুয়ারিতে পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হলেও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যক্রমে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ভোলা জেলা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ অবশ্য জানিয়েছেন, জুলাইয়ের মধ্যেই জেলা কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করবে দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড, যা মূলত দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে প্রতিটি আসনের জন্য একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে এবং সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

সব মিলিয়ে, বিএনপি এখন একটি সংকটময় কিন্তু সম্ভাবনাময় সময় পার করছে। একদিকে নতুন ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করে জনগণের সামনে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন তৈরি করা—এই দুটি চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করার ওপরই নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনে দলটির ভবিষ্যৎ।