বাঁশখালী আসন: পুনরুদ্ধার চায় বিএনপি, কোন্দলে সুবিধা দেখছে জামায়াত


আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। ঈদ শুভেচ্ছা থেকে শুরু করে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতির মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতারা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধারে জোর প্রচেষ্টা চালালেও দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে জামায়াতে ইসলামী সুযোগ হিসেবে দেখছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।

ঐতিহাসিকভাবে এ আসনটি বিএনপির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর পাঁচবার দলটি এখান থেকে জয়লাভ করে, যার মধ্যে চারবারই জেতেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। তার মৃত্যুর পর বাঁশখালীর বিএনপি রাজনীতিতে একাধিক ধারার সৃষ্টি হয়েছে, যা মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যাও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নেমেছে, যা দলটিকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

একাধিক প্রার্থীর ভিড়ে বিভক্ত বিএনপি

প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার দুই ছেলেই মনোনয়নপ্রত্যাশী। তার ছোট ছেলে ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা এবং বড় ছেলে ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর দুজনই মাঠে সক্রিয়।

এছাড়া বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে আছেন আরও বেশ কয়েকজন নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন:

* বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মফিজুর রহমান আশিক। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক কারণে তিনি ২০১৩ ও ২০২২ সালে দুবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘গুম’ হয়েছিলেন।

* সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা ইফতেখার হোসেন চৌধুরী মহসিন।

* দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও গণ্ডামারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. লেয়াকত আলী।

* চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পিপি আশরাফ হোসেন চৌধুরী রাজ্জাক।

* দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনি।

একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে জামায়াত ও অন্যান্য দল

জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলামকে একক প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে।

নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক এবং নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা মুছা-বিন ইজহারও প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।

প্রার্থীদের বক্তব্য

মনোনয়নপ্রত্যাশী মফিজুর রহমান আশিক বলেন, “দলের জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। আশা করি দল মূল্যায়ন করবে এবং বাঁশখালী থেকে নির্বাচনের সুযোগ দেবে।”

প্রয়াত জাফরুল ইসলামের ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বলেন, “আমার বাবা বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দল মনোনয়ন দিলে সাধারণ মানুষ বাবার উত্তরসূরি হিসেবে আমাকেই বেছে নেবেন বলে বিশ্বাস করি।”

সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী বলেন, “বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছি এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সরকারের রোষানলে পড়েছি। আশা করি দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।”

জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম বলেন, “দল আমাকে মনোনয়নের জন্য চূড়ান্ত করেছে। আশা করছি, বাঁশখালীর মানুষ সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে আমাকে বেছে নেবেন।”

নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও ইতিহাস

চট্টগ্রাম-১৬ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৬ জন।

এ আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৭৯ সালে বিএনপি, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি এবং ১৯৯১ সালে আবার আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।

এরপর ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের দশম, ২০১৮ সালের একাদশ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ধরে রাখেন। এর মধ্যে দুবার মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এবং সর্বশেষ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হন।

একাধিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও বাঁশখালীর সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, আগামী নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা দেখেই তারা রায় দেবেন।