
গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়া আটকে আছে রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্যের জালে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো, নির্বাচন পদ্ধতি ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের গঠনসহ বেশিরভাগ মৌলিক বিষয়েই দলগুলো একমত হতে না পারায় বহুল প্রতীক্ষিত ‘জুলাই সনদ’ নির্ধারিত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশ নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এক মাসের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ১৪টি বৈঠক করলেও মূল সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে এখনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে কমিশনের কার্যকারিতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা নিয়ে।
যেসব বিষয়ে ঐকমত্য
কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে এ পর্যন্ত যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার, প্রধান বিচারপতির নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য আইন প্রণয়ন এবং বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন।
একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফেরার বিষয়ে দলগুলো একমত হলেও এর কাঠামো ও পদ্ধতি নিয়ে মতৈক্য আসেনি।
মতানৈক্যের দীর্ঘ তালিকা
নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে:
* সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত কমিটির কাঠামো।
* দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য মনোনয়ন ও নির্বাচনের পদ্ধতি।
* সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ১০০টি করার বিষয়ে সম্মতি থাকলেও সরাসরি নির্বাচন হবে, না কি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে হবে, তা নিয়ে মতভেদ।
* প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল নির্ধারণ।
* তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা, বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রক্রিয়া।
* রাষ্ট্রের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মতো বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শক্ত অবস্থানে থাকলেও অন্য অনেক দল এর বিরোধিতা করছে।
কমিশনের প্রচেষ্টা ও সময়সীমার চাপ
জুলাই সনদ ঘোষণার জন্য সরকার ও কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার ৩১ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজও সম্প্রতি বলেছেন, “৩০ অথবা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে যেকোনোভাবে একটি সনদ তৈরি করতেই হবে। ব্যর্থতা হলে সেটি আমাদের সবার। কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়েই আমাদের ঐক্যে পৌঁছাতে হবে।”
এরইমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সময়মতো জুলাই সনদ ঘোষণা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ছাড়া সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য দরকার। অভ্যুত্থানের এক বছরের মধ্যেই তাদের মধ্যে যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “কমিশনের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলো একেক সময় একেক কথা বলে। ফলে সংস্কার হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।”
