- নিহত বৃদ্ধ মো. এনাম ও তার ছেলে মোবারক হোসেন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পুকুর থেকে এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধারের পর তার ছেলেকে হত্যার অভিযোগে পুলিশে দেওয়া হলেও ঘটনাপ্রবাহে এখন সন্দেহের তীর মোড় নিয়েছে প্রতিবেশীদের দিকে।
দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, লাশ উদ্ধারের আগেই ছেলের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীদের হত্যার অভিযোগ এবং ঘটনার পর তাদের আত্মগোপন—সব মিলিয়ে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, তা নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে।
গত ১৮ জুলাই উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার পূর্ব-ফরহাদাবাদ গ্রাম থেকে মো. এনাম (৬২) নামের ওই বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেশীদের দাবির মুখে পুলিশ ছেলে মো. মোবারক হোসেনকে আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
তবে নিহতের পরিবার বলছে, প্রতিবেশীরাই বাবাকে হত্যা করে এখন ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
ঘটনার নতুন মোড়
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত এনাম দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তিনি পৈতৃক বাড়িতে থাকতে চাইতেন বলে ছেলে মোবারক তাকে রাতে ঘরে রেখে নিরাপত্তার জন্য বাইরে থেকে তালা দিয়ে যেতেন এবং সকালে এসে খোঁজ নিতেন।
ঘটনার রাতেও মোবারক তার বাবাকে ঘরে রেখে ভাড়াবাসায় চলে যান। পরদিন সকালে এসে দেখেন, ঘরের তালাবদ্ধ থাকলেও ভেতরে তার বাবা নেই।
নিহতের মেয়ে সানজিদা শারমিন রিপা বলেন, “বাবাকে খোঁজাখুঁজির সময়েই প্রতিবেশী শাহজাহান, জসিমরা বলতে থাকে—আমার ভাই বাবাকে মেরে ফেলেছে। লাশ পাওয়ার আগেই তারা কী করে এটা বলল? আমার ভাইয়ের সঙ্গে তাদের কোনো শত্রুতা ছিল না, কিন্তু বাবার সঙ্গে বাড়ির সীমানা নিয়ে তাদের ১০ বছরের বিরোধ ছিল।”
তিনি অভিযোগ করেন, “ওরাই আমার বাবাকে রাতের আঁধারে পুকুরে ফেলে হত্যা করেছে। এরপর আমার নিরীহ ভাইটিকে মারধর করে পুলিশের হাতে দিয়ে আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”
সন্দেহের কেন্দ্রে প্রতিবেশীরা
স্থানীয়রা জানান, মোবারককে যখন পুলিশ নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি ‘আমি বাবাকে মারিনি, প্রতিবেশীরা বাবাকে মেরে আমাকে ফাঁসাচ্ছে’ বলে চিৎকার করছিলেন।
এদিকে, ঘটনার পর থেকেই প্রতিবেশী মো. শাহজাহান, জসিমসহ অভিযুক্তরা আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি যেসব ফেইসবুক পেইজে তারা ছেলের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেসব ভিডিও এখন সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যা রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত শাহজাহান ও জসিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
পুলিশ যা বলছে
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফটিকছড়ি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শেখ মো. ইয়াছিন বলেন, “এলাকাবাসীর দাবির মুখে ছেলেকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার রহস্য উন্মোচনে আমরা কাজ করছি। আশা করছি দ্রুতই আসল রহস্য উদঘাটিত হবে।”
ফটিকছড়ি থানার ওসি নূর আহমেদ বলেন, “ঘটনার গতি-প্রকৃতি রহস্যাবৃত। আমরা একটি অপমৃত্যু মামলা নিয়েছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ছেলের বিষয়টি আদালত দেখবে।”
আপাতত পুরো বিষয়টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এটি আত্মহত্যা, নাকি প্রতিবেশীদের হাতে হত্যাকাণ্ড—সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে ফটিকছড়ির মানুষ।

