
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির আগের রাতেও ক্ষমতা ধরে রাখতে অনড় ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরদিন ঢাকায় লাখ লাখ মানুষের ঢল নামার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরও তিনি শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে উঠে আসা তথ্য, তৎকালীন পুলিশ প্রধানের (আইজিপি) আদালতের জবানবন্দি এবং গণভবনের বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তার বিবরণে ৪ ও ৫ আগস্টের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার অনড় অবস্থানের চিত্র পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত শেখ হাসিনা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আভাস দেওয়া হয়।
গণভবনের উত্তপ্ত বৈঠক
তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, যিনি বর্তমানে কারাবন্দী, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, ৪ আগস্ট গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। বেলা ১১টার প্রথম বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বৈঠকে জানানো হয়, আন্দোলন গুরুতর পর্যায়ে চলে গেছে এবং তা দমনের বিকল্প নেই। তবে তৎকালীন আইজিপি তার জবানবন্দিতে বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি সরকারকে সঠিক তথ্য দিতে। সরকার তার দুর্বলতা শুনতে প্রস্তুত ছিল না। মিটিং চলা অবস্থাতেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে।”
দ্বিতীয় বৈঠকটি হয় ৪ আগস্ট রাত ১০টার দিকে। এই বৈঠকে শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, তিন বাহিনীর প্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, র্যাবের ডিজি এবং আইজিপি উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবুর রহমানও সেখানে ছিলেন।
বৈঠকে ৫ আগস্টের গণজমায়েত ঠেকানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকা শহর ও এর প্রবেশমুখে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। তবে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে জানান, “এসব আলোচনা কাজে লাগবে না। সময় ফুরিয়ে গেছে।”
পদত্যাগের চাপ ও বিরোধিতা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ৪ আগস্টের রাতকে ‘ভয়ংকর ও উত্তেজনাপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, বৈঠকে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিক পদত্যাগের প্রসঙ্গ তুললে শেখ হাসিনা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি সেনাপ্রধানকে কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “যা হওয়ার হবে, তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।”
প্রসিকিউটরের তথ্য অনুযায়ী, জেনারেল তারিক সিদ্দিক বলেন, “সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে কিছু লোককে মেরে ফেললেই বিক্ষোভ এমনিতেই দমন হয়ে যাবে।” এমনকি তিনি হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর পরামর্শ দিলে বিমানবাহিনীর প্রধান তার তীব্র বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “এই লোকটি আপনাকে ডুবিয়েছে এবং আরও ডোবাবে।”
স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ৪ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পরামর্শ দিলেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এর তীব্র বিরোধিতা করেন।
চিফ প্রসিকিউটরের মতে, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান—এই ‘গ্যাং অব ফোর’ শেখ হাসিনাকে কঠোর অবস্থানে থাকতে পরামর্শ দেন।
তবে প্রভাবশালী একটি দেশের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, ৪ আগস্ট রাত আড়াইটার দিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান ওই দূতাবাসকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন।
শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ
ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ৪ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলনে কঠোরভাবে আন্দোলন দমনের ঘোষণা দেন, যা পুলিশ বাহিনীকে ৫ আগস্ট সকাল থেকে মারমুখী করে তোলে।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ৫ আগস্ট সকালে গণভবনের বৈঠকে তৎকালীন আইজিপি শেখ হাসিনাকে জানান, পুলিশের পক্ষে কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়, কারণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসছিল এবং বাহিনীর সদস্যরা ক্লান্ত।
এরপর সামরিক কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে সার্বিক পরিস্থিতি বুঝিয়ে পদত্যাগের জন্য পুনরায় অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি রাজি হচ্ছিলেন না। পরে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ফোনে কথা বলেন। জয় পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তার মাকে ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। ছেলের কথায় শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে রাজি হন।
দেশত্যাগ
৫ আগস্ট বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা সামরিক হেলিকপ্টারে করে দেশত্যাগ করেন। গণভবন থেকে গাড়িতে করে নিকটস্থ বাণিজ্য মেলার মাঠে গিয়ে সেখান থেকে হেলিকপ্টারে কুর্মিটোলার বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে যান তারা। পরে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে (সি-১৩০) ভারতের উদ্দেশে রওনা হন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তাদের বহনকারী বিমানটি ৫ আগস্ট স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে নয়াদিল্লির কাছে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান।
