
জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মিত্রদের নিয়েই নির্বাচনী পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটির লক্ষ্য, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিজয়ী হলে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা। এই রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে আসন ভাগাভাগির মতো সবচেয়ে জটিল বিষয়টি নিয়ে আজ শুক্রবার থেকে মিত্রদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির বিজয়ের পথ অনেকটাই সহজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই সহজ সমীকরণই দলটির সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। প্রথমত, মিত্রদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি কীভাবে হবে এবং দ্বিতীয়ত, বিএনপি বড় জয় পেলে জাতীয় সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে কে?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মিত্রদের নিয়েই নির্বাচনে যাব এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করব। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্রের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সেই সরকার পরিচালিত হবে।’ আসন ভাগাভাগির বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
আসন ভাগাভাগির জটিলতা
বিএনপির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আসন ভাগাভাগির বাস্তবতা। দলটির তৃণমূলের নেতারা মনে করছেন, প্রায় সব আসনেই বিএনপির প্রার্থীদের যে জনসমর্থন রয়েছে, তার সঙ্গে মিত্র দলগুলোর প্রার্থীদের বড় ব্যবধান রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো আসন মিত্রদের ছেড়ে দেওয়া হলে সেখানে বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী কোনো নেতার স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার আশঙ্কা রয়েছে। তাতে মিত্র প্রার্থীর জয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মিত্র দলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, বিএনপি মনোনীত বা তাদের সমর্থিত নেতারাই অধিকাংশ আসনে জয়ী হবেন। এতে সংসদে একটি দুর্বল বিরোধী দল তৈরি হতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। আমরা বৈঠকে এই বিষয়টি তুলব।’
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি এরই মধ্যে আসনভিত্তিক দুই দফা জরিপ চালিয়েছে। এতে নিজ দলের পাশাপাশি মিত্র দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তাও যাচাই করা হয়েছে।
বিরোধী দল নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় আলোচনা হলো, নির্বাচনে বিএনপি একচেটিয়া জয় পেলে বিরোধী শিবিরের শূন্যতা তৈরি হবে কি না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘প্রধান বিরোধী দল কারা হবে, তা দিন শেষে জনগণই ঠিক করবে। বিষয়টি নির্ভর করছে ভোটারদের মনোভাব এবং প্রস্তাবিত জুলাই সনদের ওপর জোটের হিসাব-নিকাশের ওপর। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলেই চিত্রটি পরিষ্কার হবে।’
বিএনপির তৎপরতা ও মিত্রদের প্রস্তুতি
বিএনপি একদিকে আসন সমঝোতার জন্য আলোচনা শুরু করছে, অন্যদিকে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও মহলের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি ছারছীনা দরবার শরিফের পীরের সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের সাক্ষাৎকে এই তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি কোনো নির্দিষ্ট পন্থার দল নয়, আমরা মধ্যপন্থায় বিশ্বাসী। আমরা দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেই আলোচনা করতে চাই।’
এদিকে জামায়াতে ইসলামী ২৯৬ আসনে এবং খেলাফত মজলিস ২২৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। গণঅধিকার পরিষদ এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নতুন দল এনসিপিও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বিএনপি তার মিত্রদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবলেও জামায়াতের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
আজ শুক্রবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ১২-দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে আসন বণ্টন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করছেন তারেক রহমান। আগামীকাল শনিবার গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘বৈঠকে নির্বাচনী আলাপ হতেই পারে। জাতীয় সরকারের ধারণাটি ভালো। একটি কর্মসূচির ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার চিন্তা আমাদের আছে।’ ১২-দলীয় জোটের মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, নির্বাচন নিয়েই আলোচনা হবে। তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় কাজ করার নির্দেশনা পেয়েছেন এবং বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামও তুলে ধরতে পারেন।
