
দেশজুড়ে আবারও সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের চার জেলায় পাঁচটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা জনমনে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
এর মধ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে শত শত মানুষের সামনে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা এবং টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকা থেকে এক যুবকের খণ্ডিত লাশভর্তি স্যুটকেস উদ্ধার করা হয়েছে। একই রাতে মৌলভীবাজার শহরে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে শাহ ফয়জুর রহমান রুবেল নামে এক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীকে এবং সিলেট নগরীর কীন ব্রিজ এলাকায় ডালিম আহমদ নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এছাড়া নাটোরের লালপুরে দুর্বৃত্তরা প্রাইভেটকার থামিয়ে চালক সাইদুর রহমানকে গলা কেটে হত্যা করে। এসব ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত সাতজনকে আটক করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই সারা দেশে ১ হাজার ৯৩১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে জুন মাসেই সংঘটিত হয়েছে সর্বোচ্চ ৩৪৪টি হত্যাকাণ্ড। এই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে মোট মামলা হয়েছে ৯১ হাজার ৩৯৪টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩২৯টি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের আটটি রেঞ্জের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে খুনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। গত ছয় মাসে এই রেঞ্জে ৪৫৮টি খুনের মামলা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৩৪০টি, খুলনা রেঞ্জে ১৮২টি, রাজশাহী রেঞ্জে ১৭৫টি, রংপুর রেঞ্জে ১২৪টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ১১১টি এবং সিলেট রেঞ্জে ১০৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে কম ৭৬টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে বরিশাল রেঞ্জে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর ও সক্রিয় হওয়া জরুরি। এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “বর্তমান সময়ে খুন, অপহরণ, ডাকাতি, ছিনতাই ও নারী-শিশু নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ বেড়েছে। এখনকার প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে অপরাধীদের শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। একটি চক্র অপরাধকে আয়-রোজগারের উৎস হিসেবে নিয়েছে। অপরাধ দমাতে বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে এবং সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন পরবর্তী সময়ে মামলা বেশি হওয়ায় এই সংখ্যা বড় মনে হচ্ছে। তার ভাষ্য, “জুলাই-আগস্টের পরে যেমন পরিস্থিতি ছিল, সেটি বর্তমানে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। অপরাধ দমনে আমরা সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছি।”
পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে সারা দেশে মোট ৩ হাজার ৪৩২টি খুনের মামলা হয়েছিল, যার মধ্যে আগস্ট মাসেই হয়েছিল সর্বোচ্চ ৬২৬টি।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। গত ১৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য। এর আগে ২১ এপ্রিল তেজগাঁওয়ে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান আরমান হোসেন নামে এক তরুণ।
