১৫ আগস্ট: হতভম্ব সেনানিবাস, প্রতিরোধের উদ্যোগ নেননি কেউ


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ঢাকা সেনানিবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন হতভম্ব, দ্বিধান্বিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। প্রতিরোধ বা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উদ্যোগই তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়নি, বরং এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়েই ঘটনাবলী এগিয়ে গিয়েছিল।

সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর’-এ সেই ভোরের ঘটনাবলীর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে উঠে এসেছে তখনকার সেনানিবাসের ভেতরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি।

মেজর হাফিজের বর্ণনানুযায়ী, ঘটনার দিন ভোর পৌনে ছয়টার দিকে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর রশিদ এবং সেনাসদরের মেজর আমীন আহম্মেদ চৌধুরী তার বাসায় আসেন। শান্ত গলায় রশিদ জানান, “উই হ্যাভ ডান ইট। শেখ মুজিব হ্যাজ বিন কিলড।” এ সময় রশিদের সঙ্গে থাকা আর্টিলারি সেনারা বাসার ভেতরে ও বাইরে সতর্ক অবস্থান নেয়, যা ছিল এক প্রচ্ছন্ন হুমকি।

এরপর তারা মেজর হাফিজকে নিয়ে যান ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের বাসায়। সেখানেও রশিদ একই বার্তা দিয়ে কোনো ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি দিয়ে চলে যান। হতভম্ব কর্নেল শাফায়াত জামিল কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহর ফোন পান। ফোনে সেনাপ্রধান জানান, রাষ্ট্রপতি তাকে ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বাঁচানোর জন্য ফোর্স পাঠাতে বলেছেন, কিন্তু তিনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, “প্রেসিডেন্ট তাঁকে বিশ্বাস করলেন না।”

কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না পেয়ে কর্নেল শাফায়াত ও মেজর হাফিজ হেঁটে তৎকালীন ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসার দিকে রওনা হন। শেভিং ক্রিম মাখা মুখেই দরজা খুলে জিয়াউর রহমান সব শুনে শান্তভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, “সো হোয়াট? প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। উই উইল আপহোল্ড দ্য কনস্টিটিউশন।” তিনি শাফায়াতকে তার সৈন্যদের প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন।

সেনানিবাসের ভেতরে তখন বিদ্রোহী ট্যাংকগুলো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অবস্থান নিয়েছিল, যার একটির ওপরে ছিলেন মেজর ফারুক রহমান। ১ম ইস্ট বেঙ্গল অফিসে গিয়ে মেজর হাফিজ দেখেন, রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণা শুনে সেনারা উল্লাস করছে। এর মধ্যেই এক তরুণ লেফটেন্যান্ট রাষ্ট্রপতির ছবি দেয়াল থেকে নামিয়ে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলে, কিন্তু উপস্থিত কেউই কোনো প্রতিবাদ করেননি।

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেখানে আসেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার ও ২য় ফিল্ড আর্টিলারি তার নির্দেশ ছাড়াই বিদ্রোহ করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় কী হবে, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত খালেদ বলেন, “লেট আস বারগেইন উইথ দেম।” এর পরপরই সেনাপ্রধানের ডাকে তিনি সেনাসদরের উদ্দেশে রওনা হন, কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

সকাল নয়টার পর সেনানিবাসের চূড়ান্ত দৃশ্যপট তৈরি হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান, বিমানবাহিনী প্রধান এবং জেনারেল জিয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কর্নেল শাফায়াতের দপ্তরে আসেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভ্যুত্থানের আরেক নেতা, পুরনো ইউনিফর্ম পরা মেজর ডালিম। মেজর ডালিমের তাগাদায় এবং উপস্থিত অন্য কর্মকর্তাদের অনুরোধে তিন বাহিনীর প্রধান নতুন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে রেডিও স্টেশনের উদ্দেশে রওনা দেন। জেনারেল জিয়া অবশ্য তাদের সঙ্গে না গিয়ে নিজের দপ্তরে চলে যান।

মেজর হাফিজ লিখেছেন, তিন বাহিনী প্রধান এবং বিডিআর, পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধানদের আনুগত্য প্রকাশের ঘোষণার পর সেনানিবাসের পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়ে আসে। তার মতে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ থাকায় তারা এই পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারাদেশে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিরোধও দেখা যায়নি বলে তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেন।