
একজন সংসদ সদস্যের মূল কাজ সংসদে আইন প্রণয়ন করা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ওসমান চৌধুরী। তিনি বলেন, গত কয়েকটি সংসদে ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়ায় আইন প্রণেতার ভূমিকা ম্লান হয়ে গেছে, যা দেশের জন্য অশনিসংকেত।
শনিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর দেব পাহাড় এলাকায় নিজ বাসভবনে ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সাংবাদিক ফোরাম’-এর সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হওয়া সত্ত্বেও সাতকানিয়া-লোহাগাড়া শুধু যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে পিছিয়ে আছে উল্লেখ করে ব্যারিস্টার ওসমান বলেন, “এক সময়কার সংসদ সদস্যরা হতেন শিক্ষিত এবং বেশিরভাগই আইনজীবী। কিন্তু গত কয়েক টার্ম ধরে দেখছি, এমন মানুষজন সংসদ সদস্য হচ্ছেন, যাদের শিক্ষার আলো নেই। সংসদের লাইব্রেরি এখন খালি পড়ে থাকে, কেউ যায় না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো পার্লামেন্টারিয়ান এখন আর নেই, আছেন কেবল বিজনেসম্যান, যাদের মূল লক্ষ্যই হলো বিজনেস করা।”
সাংবাদিকদের সমাজের দর্পণ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভের মধ্যে গণমাধ্যম এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চান কিনা, তা আপনাদেরই বলতে হবে। আপনাদের লেখনিতে আওয়াজ উঠলেই তা উপরে পৌঁছাবে, আমার কথায় নয়।”
‘বিমাতাসুলভ আচরণে বঞ্চিত সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’
উন্নয়নবঞ্চনার কথা তুলে ধরে ওসমান চৌধুরী বলেন, “সবসময় সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে। এত সম্ভাবনাময় একটা জায়গা, কী নেই আমাদের! প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, পাহাড়, নদী, খাল সবকিছুই আছে। দ্বীপ চরতীর মতো জায়গায় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারতো। কিন্তু যথাযথ নেতৃত্বের অভাবে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া বিকশিত হতে পারেনি।”
উন্নয়নের জন্য শুধু সরকারের দিকে না তাকিয়ে বেসরকারি খাতের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “দেশের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীর বাড়ি সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায়। তারা চাইলে এখানে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলতে পারতেন। সরকারিভাবে সবকিছু সম্ভব না, প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোগ প্রয়োজন।”

‘মাঠ নেই, তাই কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে’
এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরির কারণ হিসেবে মাঠের অভাবকে দায়ী করে নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “এখন সাতকানিয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের কথা শোনা যাচ্ছে। আমি অবাক হই যখন দেখি ফুটবল খেলার জন্য মাঠ ভাড়া করতে হচ্ছে। আমরা ধানের জমিতে পিচ করে ক্রিকেট খেলেছি, ডাংগুলি খেলেছি। এখনকার ছেলেমেয়েরা খেলবে কোথায়? মাঠ না থাকলে কিশোর গ্যাং তো হবেই।”
‘জিয়াউর রহমান একটি আদর্শের নাম’
নিজের রাজনৈতিক আদর্শ তুলে ধরে তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমান সাহেব আমার কাছে কোনও নাম না, এটি একটি আদর্শ, একটি অনুভূতি। আমি এখনও জিয়াউর রহমানের আদর্শে চলি। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য হতে পারা আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের একটি জায়গা, যা সরাসরি তারেক রহমান ও ডা. জোবাইদা রহমান দেখাশোনা করেন।”
‘৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশ এক নয়’
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “৫ আগস্টের আগের বাংলাদেশ আর পরের বাংলাদেশ এক না। তরুণদের রক্তই ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট। দলগুলোর উচিত প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যোগ্যতা এবং মাঠ পর্যায়ের মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।”
দলের অভ্যন্তরীণ সমালোচনার বিষয়ে তিনি অকপটে বলেন, “আমি একটু বিদ্রোহী প্রকৃতির, এ কারণে হয়তো রাজনীতিতে পিছিয়ে আছি। আমি সারাক্ষণ দলের গঠনমূলক সমালোচনা করি এবং এটা অব্যাহত থাকবে। কারণ দিন শেষে সমাজকে কিছু দেওয়াই আমার কাজ।”
সরাসরি রাজনীতিতে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকায় সরাসরি মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়া নৈতিকভাবে উচিত মনে করছি না। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে কোথায় নিয়ে যায়, আমি জানি না। দল যাকেই মনোনয়ন দিক, আমার সমর্থন থাকবে। তবে আমি চাই, যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসুক।”

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচিতি
ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ওসমান চৌধুরী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মাদার্শা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি প্রয়াত আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, যিনি ২০১৯ সালে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন।
বাবার রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্কুলজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন ওসমান চৌধুরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর লন্ডন থেকে এলএলবি এবং ব্যারিস্টার অ্যাট-ল সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
দেশে ফিরে তিনি সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রয়াত এ. এফ. হাসান আরিফের চেম্বারে যুক্ত হয়ে হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ২০১৯-২০ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে কার্যকরী সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি বর্তমানে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক এবং সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য এবং সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
মতবিনিময় সভায় সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এস এম রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও চট্টগ্রাম প্রতিদিন সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মিজানুল ইসলাম, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সরওয়ার আমিন বাবু প্রমুখ।
