
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক তদন্ত ও নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা, করপোরেশন ও বিভাগে গত দেড় দশকে সংঘটিত হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো এখনো তদন্তের বাইরে রয়ে গেছে।
দেশের ২৩২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশকেই টিকিয়ে রাখতে যেখানে সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদান দিতে হচ্ছে, সেখানে তাদের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে সরকারি ক্রয় ও বিনিয়োগকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং দেশ থেকে প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই দুর্নীতির একটি বড় অংশই ঘটেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), পেট্রোবাংলা, বাপেক্স ও তিতাসের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
বিশেষ করে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের অনিয়ম-দুর্নীতির কথা শ্বেতপত্রে উঠে এলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বড় কোনো তদন্ত শুরু হয়নি। আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, রামপাল ও রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও অন্তর্বর্তী সরকার মূলত ভবিষ্যতের ব্যয় কমানোর দিকেই মনোযোগ দিয়েছে, অতীতের দুর্নীতি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে নিরীক্ষার পরিকল্পনা থাকলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
একই অবস্থা দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো খাতেও। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেলসহ আটটি বড় প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ বা ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা মতে, শুধু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কাজেই গত ১৪ বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
এ বিষয়েও উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানান, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো তদন্তের উদ্যোগ নেই, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেখবে।
এই চিত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট। নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুধু শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী স্বীকার করেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বিশেষ নিরীক্ষা নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ব্যাংক ও পুঁজিবাজার ছাড়া অন্যান্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে যে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার হয়েছে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে না।”
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া মনে করেন, সরকারের বিদ্যমান কাঠামোতেই এসব দুর্নীতি তদন্তের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা করার ক্ষমতা আছে। পাশাপাশি সিএজি ও দুদকেরও সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখার।”
