
দেশে তিন দশক ধরে দারিদ্র্য হ্রাসের ধারায় ছেদ পড়েছে; গত তিন বছরে উল্টো তা বেড়ে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে, যা ২০২২ সালে সরকারি হিসাবে ১৮.৭ শতাংশ ছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরের মানুষের আয় কমার বিপরীতে ব্যয় বেড়েছে এবং বিপুল সংখ্যক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, যা আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণ।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণায় পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনা মহামারি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ধারাবাহিক সংকট দেশের মানুষের আয়-ব্যয় ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে শহরের একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা থেকে কমে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকায় নেমেছে, কিন্তু ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। অর্থাৎ, শহরের পরিবারগুলো এখন আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে। অন্যদিকে, গ্রামের পরিবারের গড় আয় কিছুটা বেড়ে ২৯ হাজার ২০৫ টাকা এবং ব্যয় ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক গড় সঞ্চয় মাত্র ৭০ টাকা।
গবেষণায় আয়বৈষম্যের চিত্রও প্রকটভাবে উঠে এসেছে। সবচেয়ে নিচে থাকা ১০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় মাত্র ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা, যেখানে শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১ লাখ ৯ হাজার ৩৯০ টাকা। ব্যয়ের বড় একটি অংশ, প্রায় ৫৫ শতাংশ, চলে যাচ্ছে খাবারের পেছনে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় ৪০ শতাংশ পরিবারের ঋণ বেড়েছে।
পিপিআরসির গবেষণায় বর্তমান বাস্তবতায় পাঁচটি নতুন ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো—পরিবারগুলোতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝা বৃদ্ধি, প্রতি চারটি দরিদ্র পরিবারের মধ্যে একটির নারীপ্রধান হওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে ঋণের চাপ বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং স্যানিটেশন সংকট।
কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে পিপিআরসি। কর্মজীবীদের ৩৮ শতাংশ ‘ছদ্মবেকার’ বা ‘আন্ডারএমপ্লয়েড’, অর্থাৎ তারা পূর্ণ সময় কাজ পাচ্ছেন না। কর্মক্ষম নারীদের মাত্র ২৬ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে যুক্ত।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এই সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবাসী আয়, বিশাল স্থানীয় বাজার এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অভ্যস্ততার মতো কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।
তিনি সংকট মোকাবিলায় তিনটি সুপারিশ তুলে ধরেন: ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমেয়াদি জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি টাস্কফোর্স গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির পরিকল্পনায় শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, সমতা ও নাগরিক কল্যাণের ওপর জোর দেওয়া।
