নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে প্রধান তিন শক্তির অনৈক্য, সমঝোতা হচ্ছে না


আগামী জাতীয় নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান তিন রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল কনজারভেটিভ পার্টির (এনসিপি) মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে, যা নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরির আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নির্বাচন পদ্ধতির প্রশ্নে দলগুলো অনড় অবস্থানে থাকায় ‘ঐকমত্য কমিশন’ সমঝোতা তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই অচলাবস্থার কারণে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি পিআর পদ্ধতির বিপক্ষে অবস্থান নিলেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছে। বিএনপি বলছে, পিআর পদ্ধতি সংবিধানসম্মত নয়। অন্যদিকে, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা বলছেন, পিআর পদ্ধতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলে তাদের পক্ষে নির্বাচনে যাওয়া সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর এই অনড় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত হিসাব। জামায়াতে ইসলামী আশঙ্কা করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, যা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রশাসনে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের অর্জিত অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলবে।

অন্যদিকে, এনসিপি এখনো দলীয়ভাবে পুরোপুরি সংগঠিত হতে পারেনি এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়াও শেষ হয়নি। দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম ইতোমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই মুহূর্তে নির্বাচনে গেলে ভালো ফল আসবে না জেনেই তারা সময় নিতে চাইছে।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনের পক্ষে থাকলেও অন্য দুই প্রধান শক্তির আপত্তির কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই অনৈক্য যদি চলতে থাকে এবং নির্বাচন যদি সময়মতো না হয়, তবে অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, এই অচলাবস্থা দেশকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা থেকে উগ্রবাদের উত্থান বা ফৌজিশাসনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আভাস দিয়ে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির বিপক্ষে নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে দলটি জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্য অংশীদারদের নিয়ে জোট গঠনের চিন্তাভাবনা করছে।

সোমবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয় বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হতে দেওয়ার হুমকিকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি মনে করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে গণভোট বা গণপরিষদের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। সংবিধানের ওপরে সনদকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আদালতের পর্যালোচনার সুযোগ বন্ধ করার মতো অঙ্গীকারও অগ্রহণযোগ্য। দলটি মনে করে, যেসব সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন, তা পরবর্তী নির্বাচিত সংসদই করবে।

বৈঠকে জামায়াত ও এনসিপির পিআর-নির্ভর শর্ত এবং নির্বাচন হতে না দেওয়ার বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “রমজানের এক সপ্তাহ আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা নেই। দু-একটি দল বিভ্রান্তির চেষ্টা করছে, যা তাদের কৌশল হতে পারে। যারা নির্বাচনের বিপক্ষে কথা বলবে, তারা রাজনীতি থেকে মাইনাস হয়ে যাবে।”

বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা অন্য মিত্র এবং কয়েকটি ইসলামী ঘরানার দলের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নিয়ে জোট হতে পারে। কয়েকটি ইসলামী ঘরানার দলের সঙ্গেও জোট হতে পারে। তবে জামায়াতের সঙ্গে জোটের সুযোগ নেই।”

বিএনপির এই কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেকার গভীর অনৈক্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি আশঙ্কা করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে বিএনপি বিপুল বিজয় লাভ করবে, যা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অর্জিত অবস্থানকে খর্ব করতে পারে। এ কারণেই তারা পিআর পদ্ধতিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে ধরে রেখেছে।

বৈঠকে পুলিশ ও প্রশাসনের রদবদল নিয়েও আলোচনা হয় এবং এসবে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা থাকার প্রচারণা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ভার্চুয়ালি যোগ দেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খান।