ইউএনও যখন আস্থার ঠিকানা


সেদিন চারদিকে থইথই পানি, আর তাঁর চোখেও জল। পানিবন্দী লাখো মানুষের জন্য সাহায্য আসছে না, যা আসছে তার বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে অন্য জেলায়। চট্টগ্রামের মানুষ যেন জানেই না, ফটিকছড়ির কী ভয়াবহ অবস্থা! বিপর্যস্ত ও অসহায় মুহূর্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ভরসা রাখলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুকে বন্যা পরিস্থিতির একটি ছবি পোস্ট করতেই ঘটল অভাবনীয় ঘটনা। সাহায্যের গাড়ির মুখ ঘুরতে শুরু করল ফটিকছড়ির দিকে। রাতের আঁধারেই হাজির হলো শত শত উদ্ধারকারী দল।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ২১ মাস ধরে এভাবেই চট্টগ্রামের ফটিকছড়িবাসীর সুখে-দুঃখে, সংকটে ও সম্ভাবনায় আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন ইউএনও মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি কখনো বন্যাদুর্গতের জন্য নির্ঘুম রাত কাটানো ত্রাণকর্তা, কখনো বন্যপ্রাণী রক্ষায় সোচ্চার কর্মকর্তা, আবার কখনো লাঞ্ছিত শিক্ষকের শয্যাপাশে দাঁড়ানো এক মানবিক অভিভাবক। প্রশাসনিক কাজের গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন মানুষের আস্থার প্রতীক।

যখন দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় ফেসবুক

ডিজিটাল যুগের জনপ্রশাসনের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তাঁর ফেসবুক ওয়াল যেন ফটিকছড়িবাসীর জন্য এক খোলা জানালা। গত ২৪ আগস্ট কাঞ্চননগরে গণপিটুনিতে হতাহতের অমানবিক ঘটনা ঘটলে তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘অসমর্থনযোগ্য’ বলে পোস্ট দেন। কেবল লিখেই থেমে থাকেননি, দ্রুত ছুটে যান হতাহতদের পরিবারের কাছে, বাড়ান সাহায্যের হাত। চিকিৎসার সব দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে।

এর আগে, ১৩ আগস্ট একজন লাঞ্ছিত ও আহত শিক্ষককে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখতে যান তিনি। তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ আইনি সহায়তার আশ্বাসও দেন। যেকোনো প্রয়োজনে তাঁর ফেসবুক ওয়াল হয়ে ওঠে যোগাযোগের সেতু।

সহকর্মী ও সাধারণের চোখে

‘জনসেবাই জনপ্রশাসন’—এই বাক্যটির বাস্তব রূপ তিনি। এমনটাই মনে করেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. তানবীর আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “সকাল নয়’টা থেকে গভীর রাত অবধি দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি মানবিক কাজটাও যেন স্যারের প্রতিদিনের রুটিন।”

তাঁর কর্মনিষ্ঠা আর সৃজনশীলতার ছোঁয়া লেগেছে উপজেলা পরিষদ চত্বরেও। উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথের ভাষায়, “তিনি যোগদানের পর পরিষদের পুরোনো অডিটোরিয়ামকে নান্দনিক করে তোলা, ভবনের সৌন্দর্যবর্ধন—সবই তাঁর অবদান। পুরো চত্বরটি এখন সৌন্দর্যের সমাহার।”

প্রবীণ সাংবাদিক রাশেদ মাহমুদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল বশরের মতো নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নির্দ্বিধায় বলেন, “তিনি অনেক ভালো মানুষ।” তাঁর কাজের স্বচ্ছতা আর আন্তরিকতা জয় করেছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মন।

হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরীর মতে, “মানুষের ভুলত্রুটি থাকতেই পারে, কিন্তু এতদিনেও স্যারের বিরুদ্ধে কোনো মানুষ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেনি। এটাই তাঁর সততার বড় প্রমাণ।”

তরুণদের অনুপ্রেরণা

তরুণ প্রজন্মের কাছেও মোজাম্মেল হক চৌধুরী এক অনুপ্রেরণার নাম। ছাত্রনেতা আকিব হাসান মাহি বলেন, “ক্লান্তি ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি প্রত্যেক অসহায়ের পাশে দাঁড়ান। তাঁর নেতৃত্ব ও সেবামূলক মানসিকতা আমাদের পথ দেখায়।”

তবে এত প্রশংসার মাঝেও নিজেকে সাধারণ সেবক ভাবতেই ভালোবাসেন ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, “প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে মানুষের ভালোবাসার মধ্য থেকে কাজ করতে চেষ্টা করি। বন্যার সময় চার-পাঁচ রাত জেগে কাজ করা জীবনের পরম সৌভাগ্য। ফটিকছড়ির মানুষকে আমি অনেক ভালোবাসি। তারা ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকব।”

তাঁর এই কথায় প্রতিধ্বনিত হয় একজন প্রকৃত জনসেবকেরই কণ্ঠস্বর, যিনি পদ-পদবির ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন মানুষের কল্যাণে।