বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ঐতিহাসিক রায়: সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় হচ্ছে, ফিরল ৭২-এর ১১৬ অনুচ্ছেদ

উচ্চ আদালত
বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পথ খুলল এক ঐতিহাসিক রায়ের মধ্য দিয়ে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একইসঙ্গে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছে। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।

এই রায়ের ফলে বর্তমানে প্রচলিত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের ‘জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা’ অসাংবিধানিক ও বাতিল বলে গণ্য হবে।

কী বদলাল এই রায়ে?

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানের পূর্ণ ক্ষমতা ছিল সুপ্রিম কোর্টের হাতে। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। বর্তমান সংবিধানে বলা আছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

হাইকোর্টের আজকের রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী এবং ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তনগুলো সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৯৭২ সালের মূল অনুচ্ছেদটি পুনরুজ্জীবিত হবে। এখন থেকে বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাবিধানের বিষয়টি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টই দেখভাল করবে।

আদালত রায়ে বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুসারে তিন মাসের মধ্যে একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হলো।”

যেভাবে এলো এই রায়

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী একটি রিট আবেদন করেন। সেই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আজ রায় ঘোষণা করা হলো।

আদালতে রিটকারীদের পক্ষে জোরালো সওয়াল-জবাব করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। এছাড়া, অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূইয়া এবং পক্ষভুক্ত হয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম শুনানিতে অংশ নেন।

আদালত রায়ে সংবিধান ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা জড়িত থাকায় রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের সুযোগ দিয়ে একটি সার্টিফিকেটও ইস্যু করেছেন। ফলে রাষ্ট্রপক্ষ এখন এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এই রায় বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ এবং স্বাধীনতার পথে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।