আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের নির্বাচনে ফেরার পথ বন্ধ?


আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন ব্যবস্থায় একগুচ্ছ যুগান্তকারী সংস্কারের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত এই সংশোধনী পাস হলে আদালত কর্তৃক ফেরারি ঘোষিত কোনো আসামি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যা ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং শীর্ষ নেতাদের ভোটের পথ কার্যত বন্ধ করে দেবে।

বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ এই তথ্য জানান। তিনি নিশ্চিত করেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং নির্বাচনি আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।

মূল লক্ষ্য: পলাতক ও ফেরারিদের ভোট থেকে বিরত রাখা

৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দেশ ছেড়েছেন বা পালিয়ে আছেন। জুলাই গণহত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার চলছে এবং অনেককে ইতোমধ্যে পলাতক ঘোষণা করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইসির নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আদালত ঘোষিত ফেরারি আসামিরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। এমনকি তাদের জন্য অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগও বন্ধ রাখা হবে। ফলে, পলাতক নেতারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

‘না’ ভোটের প্রত্যাবর্তন, থাকছে না বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ

২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইসি। নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো আসনে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলেও তাকে নির্বাচন করতে হবে। ভোটাররা সেই প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি ‘না’ ভোটও দিতে পারবেন। অর্থাৎ, একক প্রার্থী হলেও তাকে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে।

বাড়ছে ইসির ক্ষমতা, অনিয়মে পুরো আসনের ভোট বাতিল

নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত করতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম হলে শুধু সেই কেন্দ্রের ভোটই নয়, প্রয়োজনে পুরো আসনের নির্বাচন বা ফলাফল বাতিল করার ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে ইসি। হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে নির্বাচিত হওয়ার পরও একজন এমপির পদ বাতিল হতে পারে। এছাড়া, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অবহেলা বা অনিয়মের জন্য কঠোর শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।

আরপিও সংশোধনের আরও উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব:

* জামানত বৃদ্ধি: প্রার্থীদের জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

* আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নতুন সংজ্ঞা: সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী এবং কোস্টগার্ডকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

* ইভিএম বাতিল: ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংক্রান্ত সকল বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে।

* সমভোটে পুনঃনির্বাচন: দুই প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির পরিবর্তে ওই আসনে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

* মিথ্যাচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার রোধ: এআই (AI) ব্যবহার করে অপপ্রচার বা মিথ্যাচার করলে প্রার্থী, দল বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

* দলীয় অনুদান: রাজনৈতিক দলগুলো এখন থেকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয় পর্যায় থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান নিতে পারবে, যা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হতে হবে।

এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে উঠবে। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ আকারে জারি করবেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে তা হবে বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে একটি মাইলফলক, যা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করবে।