
রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সংস্কারের ‘জুলাই জাতীয় সনদের’ চূড়ান্ত খসড়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সনদের প্রাধান্য সংবিধানের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার এবং সনদ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বাতিলের মতো বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করা হচ্ছে।
সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা চূড়ান্ত দলিলে উল্লেখ না করে সুপারিশ আকারে সরকারের কাছে দেবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বুধবার সংসদ ভবনে কমিশনের এক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট সনদের সমন্বিত খসড়াটি মতামতের জন্য ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে পাঠায় কমিশন। ২৮টি দলের কাছ থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে গত এক সপ্তাহ ধরে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
খসড়া সনদের অঙ্গীকারনামা অংশের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি তোলে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ধারাগুলোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিশন সূত্র।
কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “সনদের অঙ্গীকারনামা অংশে ভাষাগত কিছু পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামত সমন্বয় করা হচ্ছে।”
যেসব ধারায় পরিবর্তন আসছে
পূর্ণাঙ্গ খসড়ার দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছিল, ‘বিদ্যমান সংবিধান ও আইনে যা কিছুই বলা থাকুক, প্রাধান্য পাবে জুলাই সনদ’। সংবিধানের ওপর কোনো সনদকে প্রাধান্য দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয় বিএনপি।
কমিশন সূত্র জানায়, এই আপত্তির কারণে ধারাটিতে ভাষাগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, সংস্কারের যেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে, শুধু সেসব ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধানের চেয়ে সনদের সুপারিশ প্রাধান্য পাবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার যে সুপারিশে দলগুলো একমত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধানের চেয়ে সনদের এই সুপারিশটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।
খসড়ার তৃতীয় দফায় সনদের ব্যাখ্যা দেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের আপত্তি ছিল। তাদের মতে, এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হওয়ায় এর ব্যাখ্যা আদালতের হাতে থাকা উচিত নয়। সূত্র জানিয়েছে, এই অঙ্গীকারটি সনদ থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
চতুর্থ দফায় সনদের বৈধতা বা কর্তৃত্ব নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রহিত করার কথা বলা হয়েছিল। কয়েকটি দল নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্নের কারণ দেখিয়ে এর বিরোধিতা করে। এখন এই ধারায় পরিবর্তন এনে বলা হতে পারে যে, সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো দল এটি নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তুলবে না।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে এমন অঙ্গীকার রাখা হচ্ছে, যা আইনি দিক থেকে গ্রহণযোগ্য ও রাজনৈতিকভাবে টেকসই হবে। শিগগিরই দলগুলোকে সই করার জন্য চূড়ান্ত খসড়া দেওয়া হবে।”
বাস্তবায়ন পদ্ধতি সনদের বাইরে
সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোট, গণপরিষদ, সংসদ বা অধ্যাদেশ—এরকম কয়েকটি বিকল্প দলগুলোর সামনে তুলে ধরেছিল কমিশন। এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য থাকায় বাস্তবায়ন পদ্ধতি সনদের অংশ হচ্ছে না।
বদিউল আলম মজুমদার জানান, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সনদ বাস্তবায়নের কয়েকটি বিকল্প পদ্ধতি নির্ধারণ করে সরকারকে সুপারিশ আকারে দেওয়া হবে। সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কোন পদ্ধতিতে সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।
সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সনদ চূড়ান্ত করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে। বৃহস্পতিবার কমিশনের বৈঠকে খসড়াটি চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে।
