- দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সমবায়ী প্রতিষ্ঠান চকরিয়ার বদরখালী সমিতির প্রধান কার্যালয়।
ব্রিটিশ আমলে ভূমিহীন ২৬২টি পরিবারকে নিয়ে যে সমিতির যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৯৫ বছর পর কক্সবাজারের চকরিয়ার সেই ‘বদরখালী সমবায় কৃষি উপনিবেশ সমিতি’ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সমবায়ী প্রতিষ্ঠান। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সমিতিটি বদলে দিয়েছে উপকূলের হাজারো মানুষের ভাগ্য।
১৯২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার চকরিয়ার উপকূলীয় বদরখালী এলাকার ৩,৭৭৭ একর ম্যানগ্রোভ ভূমি ২৬২টি বাস্তুহারা পরিবারকে বরাদ্দ দেয়। পরের বছর ১৯৩০ সালে তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয় এই সমিতি।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, “৯ দশকে এসে আজ এই সমবায় সমিতি পুরো দেশের সমবায়ের জন্য একটি অনন্য মডেলে পরিণত হয়েছে। বদরখালীর লক্ষাধিক মানুষ আজ এই সমিতির বদৌলতে তাদের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে।”
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক সম্প্রীতি
সমিতির মাধ্যমে পাওয়া জমিতে এখানকার মানুষ ধান, লবণ ও চিংড়ি চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এখানে উৎপাদিত লবণ ও চিংড়ি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোছাইন জানান, “আমাদের এখন প্রায় ১,৫০০ সদস্য আছে, তাদের প্রত্যেকের ১১.৬০ একর জমি রয়েছে। বদরখালী ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বর্তমানে সমিতির মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন।”
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, “বদরখালী ইউনিয়নে কোনো ভূমিহীন কৃষক নেই। সকলেরই সমান আবাসন, কৃষি ও বাণিজ্যিক জমি রয়েছে। এমনকি সমিতির অধীনে থাকা অভিন্ন জমি থেকে উপার্জিত অর্থও সদস্যদের মধ্যে সমানভাবে বিতরণ করা হয়।”
সমিতির সদস্য ও চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা গালিব জানান, এখানে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের জন্য আলাদা পাড়া তৈরি করা হয়েছে, যা শুরু থেকেই সমিতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
- সমিতির মাধ্যমে বদলে যাওয়া চকরিয়া উপজেলার জনবহুল জনপদ বদরখালী।
শিক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত
এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে শিক্ষার হার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি। সমিতির অর্থায়নে এখানে ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি কলেজ এবং বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
সমিতির সাবেক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী বলেন, “সরকার বাধ্যতামূলক করার আগেই সমিতি এই অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। এখানকার বাসিন্দাদের জন্য সুদবিহীন শিক্ষা ঋণও দেওয়া হয়।”
এরই সুবিধাভোগী বদরখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, “১৯৭৭ সালে হাইস্কুলে পড়ার সময় ২০০০ টাকা এবং ১৯৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ৫০০০ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। পরে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে কোনো সুদ ছাড়াই সেই ঋণ পরিশোধ করেছি।”
দুর্ভিক্ষ জয়ের ‘ধর্মগোলা’
যেকোনো সংকটকালে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমিতির রয়েছে ৫ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল। এর চল শুরু হয়েছিল ‘ধর্মগোলা’ নামক একটি যৌথ খাদ্য ব্যাংক থেকে।
সমিতির সিনিয়র সদস্য ও কক্সবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক জিএম আশেক উল্লাহ বলেন, “১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ধর্মগোলা থেকে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়েছিল। তখন সমিতির প্রবীণ সদস্যরা প্রায় ১২০০ মণ চাল আপৎকালীন তহবিল হিসেবে মজুদ রেখেছিলেন, যার কারণে এই এলাকায় কেউ অনাহারে মারা যায়নি।”
একটি ‘মিনি সেক্রেটারিয়েট’
বর্তমানে সমিতির বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা। ৪৫টি মসজিদ, একটি মন্দির, কবরস্থান ও শ্মশানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অবকাঠামো পরিচালনা করে সমিতি।
সমিতির বর্তমান সম্পাদক মঈন উদ্দিন বলেন, “আমাদের এই সমিতি গেল ৯৫ বছরে ইউনিয়নের একটি মিনি সেক্রেটারিয়েটে পরিণত হয়েছে। এটি এখানকার অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল অবকাঠামো নিয়ে কাজ করার কেন্দ্র।”


