
ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যবসায়ীকে ভয় দেখিয়ে ৫২ কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমীলা জামানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অভিযোগে মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে, যেখানে জাবেদ দম্পতিকে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. সজীব আহমেদ সংস্থাটির ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে উঠে এসেছে থার্মেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাদির মোল্লাকে চাপ দিয়ে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘুষ আদায়, অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, এই অর্থ পরবর্তীকালে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি গুরুতর অপরাধ।
যেভাবে সাজানো হয়েছিল ঘুষের ফাঁদ
দুদকের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমীলা জামান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে (ইউসিবি) নিজেদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবহার করতেন। ২০২২ সালের ১২ জুন ইউসিবির প্রিন্সিপাল শাখায় থার্মেক্স গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান—থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন লিমিটেড ও ইনডিগো স্পিনিং লিমিটেড—ঋণের জন্য আবেদন করে। একই বছরের ৬ জুলাই ব্যাংকের বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদিত হয়।
মূল কারসাজি শুরু হয় ঋণ বিতরণের পর। থার্মেক্স নিট ইয়ার্নের নামে অনুমোদিত ৩০ কোটি টাকার ঋণ থেকে ২৫ কোটি টাকা তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী জাবেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পাঁচটি বেনামি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—র্যাডিয়াস ট্রেডিং, ক্লাসিক ট্রেডিং, লুসেন্ট ট্রেডিং, মডেল ট্রেডিং এবং ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ৫ কোটি টাকা করে জমা হয়।
একইভাবে, ২০২১ সালের নভেম্বরে আদুরী নিট কম্পোজিট লিমিটেডের ছয়টি চেকের মাধ্যমে আরও ২৭ কোটি টাকা জাবেদের বেনামি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। দুদকের দাবি, এই ৫২ কোটি টাকাই থার্মেক্স গ্রুপের কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের অংশ।
কর্মচারীদের নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান, নেপথ্যে জাবেদ
তদন্তে দুদক জানতে পারে, যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল, সেগুলোর মালিক হিসেবে আরামিট গ্রুপের সাধারণ কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করা হয়। আরামিট গ্রুপের মালিকানা জাবেদ ও রুকমীলা জামানের। এজাহারে বলা হয়েছে, জাবেদ দম্পতি তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সৈয়দ কামরুজ্জামান এবং কোম্পানি সেক্রেটারি উৎপল পালের মাধ্যমে পিয়ন ও মার্কেটিং অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো কর্মচারীদের নামে এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান খোলেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—ইউসিবির সাবেক পরিচালক সৈয়দ কামরুজ্জামান, আরামিট পিএলসির এজিএম উৎপল পাল, এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক হিসেবে দেখানো আরামিট গ্রুপের কর্মচারী মো. আব্দুল আজিজ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ মিছাবাহুল আলম, মো. ফরিদ উদ্দিন, মোহাম্মদ জাহিদ, নুর মোহাম্মদ ও মো. ইয়াছিনুর রহমান।
ব্যাংকে অনুপস্থিত চেয়ারম্যান, ক্ষমতার কেন্দ্রে জাবেদ
দুদক বলছে, রুকমীলা জামান ইউসিবির চেয়ারম্যান পদে থাকলেও তিনি ব্যাংকে প্রায় আসতেন না। তার স্বামী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদই প্রতিদিন বিকেলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চেয়ারম্যানের কক্ষে বসে দাপ্তরিক কাজ করতেন এবং ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডিসহ অন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিতেন। পরিচালনা পর্ষদের সভাতেও তিনি সভাপতিত্ব করতেন। পরে গুলশানের বাসায় গিয়ে রেজুলেশনে রুকমীলা জামানের স্বাক্ষর নেওয়া হতো। এভাবেই মন্ত্রীত্বের প্রভাব খাটিয়ে জাবেদ পুরো ব্যাংকটিকে তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।
ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির আবেদন
চট্টগ্রামের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ভূমি প্রতিমন্ত্রী ও পরে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
এরই মধ্যে জাবেদ ও তার স্ত্রীর নামে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। তাদের ৩৯টি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৫ কোটি ২৬ লাখ টাকাও জব্দ করা হয়েছে। তবে গত ৭ অক্টোবর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির আগেই তারা বিদেশে পাড়ি জমান বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
এই পরিস্থিতিতে, বৃহস্পতিবার জাবেদ ও রুকমীলাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির জন্য আদালতে আবেদন করেছে দুদক। ইউসিবি থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অন্য একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তারের জন্য এই আবেদন করা হয়েছে।
