রক্তের খোঁজে আর শহরে ছুটতে হবে না, ফটিকছড়িতেই ‘ব্লাড ব্যাংক’


থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত সন্তানের জন্য প্রতি মাসে রক্ত জোগাড় করতে চট্টগ্রামের পথে ছোটেন ফটিকছড়ির অসংখ্য বাবা-মা। জরুরি প্রয়োজনে এক ব্যাগ রক্তের জন্য শহরের ব্লাড ব্যাংকগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর কষ্ট আর পথের ভোগান্তি—এখানকার মানুষের জন্য এটি এক পরিচিত দৃশ্য। রক্তের অভাবে বা সময়মতো রক্ত না পাওয়ায় কত জীবন যে সংকটে পড়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তবে এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ আর অপেক্ষার অবসান ঘটাতে আশার আলো হয়ে এসেছে ‘ফটিকছড়ি ব্লাড ব্যাংক এন্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার’।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভায়, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের খুব কাছেই যাত্রা শুরু করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এটি শুধু একটি রক্ত সংরক্ষণাগার নয়, বরং উপজেলার হাজারো রোগীর জন্য এক নতুন ভরসার ঠিকানা। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কষ্ট লাঘব করাই এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আর এই মহৎ উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন ফটিকছড়িরই কৃতি সন্তান, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. জয়নাল আবেদীন মুহুরী।
নাড়ির টানে সেবার ব্রত

ডা. জয়নাল আবেদীন মুহুরী তার মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মোমেনা-আনোয়ার মুহুরী থ্যালাসেমিয়া সেন্টার’। সেই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেই এই ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। নিজের জন্মস্থানের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই কাজে হাত দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে ডা. জয়নাল আবেদীন মুহুরী বলেন, “ফটিকছড়ি আমার গর্বের জায়গা। নাড়ির টানেই সেবার ব্রত নিয়ে সবার পাশে থাকতে চাই। আমি চাই না, একটি রোগীও যাতে রক্তের প্রয়োজনে কিংবা বিনা চিকিৎসায় হারিয়ে যায়। এই যাত্রায় আমি সবার সহযোগীতা চাই।”
এক মহতী উদ্যোগের সূচনা

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, থ্যালাসেমিয়া সচেতনতামূলক এক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই ব্লাড ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির সহযোগিতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমাজের গুণীজনেরা। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. শরীফ আশরাফউজ্জামান।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শহীদুল্লাহ, রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং এরিস্টোক্র্যাট এর প্রেসিডেন্ট একে এম শহীদুল্লাহ্, ডা. মোজাম্মেল হোসেন পলাশ, ডা. সাইফুল ইসলাম নাইম, ডা. রিয়াজ আমিন, ডা. সালমা, ডা. তানভীরসহ আরও অনেকে।

উদ্বোধনী দিনেই দুজন অসহায় থ্যালাসেমিয়া রোগীকে আমৃত্যু বিনামূল্যে রক্ত পরিসঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয় এবং ৫০ জন রোগীর বিনামূল্যে রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

শুধু রক্তদান নয়, পূর্ণাঙ্গ সেবা

উদ্যোক্তারা জানান, এটি ফটিকছড়ির প্রথম সরকারি অনুমোদিত ব্লাড ব্যাংক। এখানে প্রতিদিন অন্তত ১০ জন রোগীর রক্ত পরিসঞ্চালনের ব্যবস্থা রয়েছে। পিসিভি, আরসিসি ব্লাডের মতো বিশেষায়িত রক্তের জন্য এখন আর শহরের পানে ছুটতে হবে না।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, বিভিন্ন চিকিৎসক ও বিত্তবানদের সহযোগিতায় প্রতি মাসে অন্তত ১৫ জন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রক্ত দেওয়া হবে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ব্যয়বহুল ওষুধের খরচ কমাতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে রোগীদের কাছে বাজার মূল্যের প্রায় অর্ধেকে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়া, যাকাত ফান্ড থেকে প্রতি মাসে অন্তত পাঁচজন রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হবে।

ফটিকছড়ির মানুষের জন্য এই ব্লাড ব্যাংক তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক মানবিক আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি, যা রক্তের প্রয়োজনে ছুটে চলা পরিবারগুলোকে দেবে স্বস্তি আর রোগীদের দেবে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা।