মুছার ‘নিখোঁজ’ হওয়া ঘিরেই রহস্য

Screenshot_27চট্টগ্রাম: পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনায় ‘নির্দেশদাতা’ হিসেবে উঠে এসেছে কামরুল ইসলাম ওরফে মুছা নামের এক ব্যক্তির নাম। এ মামলায় গ্রেফতার হওয়া ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে মুছার বিষয়ে এ তথ্য দিয়েছেন। এর আগে গত ২২ জুন ভোরে বন্দর এলাকার বাসা থেকে মুছাকে পুলিশ আটক করে বলে দাবি করেছেন তার স্ত্রী পান্না আক্তার। এখন প্রশ্ন উঠেছে, মুসা তাহলে কোথায়? এদিকে বাবুল আক্তারসহ উর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সোর্স হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে এই মুছা। সে হিসেবে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই মুসাকে ভালোভাবে চেনার কথা। কিন্তু মিতু খুনের ভিডিও ফুটেজ দেখার পরও এসব কর্মকর্তা ও বাবুল আক্তার কেন মুসাকে শনাক্ত করতে পারলেন না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মিতু হত্যার রহস্য আটকে আছে মুছাইকে ঘিরেই। বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে খুনের নির্দেশ কে দিল, কেন দিল- তা জানতে মুছার সন্ধান পাওয়া জরুরী। অন্যথায় অপ্রকাশিত থেকে যেতে পারে ‘নির্দেশদাতা’র নাম?

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, হত্য রহস্য উন্মোচনের দ্বারপ্রান্তে আছি। মুছাসহ যেসব আসামি পলাতক রয়েছে, তাদের গ্রেফতারে আমাদের তিনটি টিম কাজ করছে। তাদের ধরতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। আশা করছি মুছাসহ অন্য আসামিরা ধরা পড়কে। এখন যেসব তথ্য আমাদের কাছে আছে, তা সর্বসাধারণকে জানানো বিষয় নয়। তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলে সবকিছু জানা যাবে।

এদিকে মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার জানান, গত ১২ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় মুছার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় তার তিন ভাইকে আটক করে নিয়ে যায়। পরদিন তাদের নিয়ে নগরীর কালামিয়া বাজার এলাকায় মুছার বাসায় অভিযান চালায়। তবে ওই বাসাটি পরিবর্তন করে বন্দর এলাকায় নতুন বাসা নেয়ায় সেখানে মুছাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুছার বন্ধু নবীর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গত ২২ জুন ভোরে বন্দর এলাকায় নতুন বাসায় যায় পুলিশ। তবে সেসময় মুছা বাসায় না থাকায় পান্না আক্তারের মোবাইল ব্যবহার করে নবীকে দিয়ে ফোন করিয়ে মুছাকে আনা হয়। এরপর সেখান থেকে মুছাকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার পর আর তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে গত রোববার রাতে চট্টগ্রাম আদালতে ওয়াসিম ও আনোয়ার নামে দুই আসামির জবানবন্দি দিয়েছে। এতে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে এই দুই আসামি। এছাড়া কার মাধ্যমে তারা খুনের চুক্তি পেয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য দিলেও জবানবন্দিতে সেই পরিকল্পনাকারীর নাম নেই। আসামিদের দাবি, এ হত্যার মাধ্যমে মুছা নামে এক ব্যক্তি তাদেরকে পাঁচ-সাত লাখ দিবে বলেছিল। সেই মুছাকে গত ২১ জুন পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার; এরপর থেকে মুছার অবস্থানের বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করেনি পুলিশ। এখন মুছা যদি ‘নির্দেশদাতা’র নাম বলার আগেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়, তাহলে মামলা তদন্ত এখানেই থেমে যাবে। এতে দুই আসামির জবানবন্দির পরও রহস্যজট কাটবে না, বরং আরো আরো ঘনীভ’ত হবে। সবমিলিয়ে তদন্তের গতিপথ নিয়ে এখন জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে সন্দেহ। এমনকি মিতু হত্যার পর থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের গরমিল এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণেও চলছে সমালোচনা।

এদিকে মামলার বাদি বাবুল আক্তারকে গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত টানা ১৫ ঘন্টা ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ নিয়ে জনমনে নানা সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ছে। বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় যে সব আসামিদের মুখোমুখি করা হয়েছিল, তাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি পুলিশ। তাদের কাউকে আদালতে সোপর্দও করা হয়নি। গত শনিবার বিকেলে নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকা থেকে মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম ও রাতে ফটিকছড়ি উপজেলা থেকে আনোয়ার হোসেন এবং গত মঙ্গলবার রাতে মুছাকে গ্রেফতার করা হয়। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত বাবুল আক্তারের মুখোমুখি করা আটক সন্দেহভাজনরা কোথায়? সেসময় বাবুল আক্তারের উপস্থিতিতে আসামিরা কি বলেছিল- তা নিয়ে রহস্যের অন্ত নেই। তেমনি বাবুল আক্তারকে পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল কিনা- তা নিয়েও নানা কথা ছড়াচ্ছে চারদিকে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, মিতু হত্যায় বাবুল আক্তারের সংশ্লিষ্টতা আছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এনিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। কিন্তু স্ত্রীকে সরিয়ে দিলে বাবুলের কী লাভ হবে সে বিষয়টি এখনো পরিস্কার নয়। অভিযোগের তির আসার পর থেকে বাবুল চুপ আছেন। গত রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত কয়েক দফায় তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য জানা যায়নি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কোন কারণে অভিযোগ শুনে বাবুল চুপ হয়ে গেছেন নাকি তাকে চুপ করে দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, মুছার অবস্থান নিয়ে আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। আমরা এখনো তদন্ত শেষ করিনি। তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলে সব জানতে পারবেন।