
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ঠিকাদারের লাইসেন্স নবায়ন থেকে শুরু করে সড়ক নির্মাণ—সর্বত্রই উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরী বিরুদ্ধে উঠেছে স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক দুর্নীতির শক্তিশালী অভিযোগ।
ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা বলছেন, তার তৈরি করা এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এখানে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রকৌশলীর আরোপিত নিয়ম মানতেই বাধ্য করা হচ্ছে সবাইকে, আর প্রতিবাদ করলেই কাজ হারানোর ভয় দেখানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়নকে কেন্দ্র করে এই প্রকৌশলীর দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি লাইসেন্স নবায়নের ফি ৪ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরী প্রত্যেক ঠিকাদারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করতে বাধ্য করেছেন।
ঠিকাদার সুমন বলেন, “প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরী নিজেকে অত্যন্ত চতুর কর্মকর্তা হিসেবে জাহির করেন। আমরা সরকারি ফির কথা বললে তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন, ‘এখান থেকে ইউএনও সাহেবকেও ভাগ দিতে হয়, তাই দশ হাজারের কমে কোনো সুযোগ নেই’।” এই অজুহাতে উপজেলার প্রায় ৩০ জন পুরাতন এবং ১০ জন নতুন ঠিকাদারের কাছ থেকে তিনি অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা করে আদায় করেছেন, যার মোট পরিমাণ দুই লক্ষাধিক টাকা।
অনেক ঠিকাদার ভবিষ্যতে কাজ না পাওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ। ঠিকাদার আকতারুজ্জামান বলেন, “কী আর করা, ঝামেলায় না জড়াতে চেয়ে ১০ হাজার টাকা দিয়েই লাইসেন্স নবায়ন করেছি। এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পরে আর কাজই পাওয়া যাবে না।”
প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর শুধু আর্থিক অনিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়, তার তত্ত্বাবধানে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মান নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। উদাহরণস্বরূপ, উপজেলার ৪নং বটতলী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের আছলত খাঁন সড়কের নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। প্রায় ১৩০০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের কাজে অত্যন্ত নিম্নমানের ও ভাঙা ইট ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. খলিল জানান, “বহু বছর পর সড়কের কাজ শুরু হওয়ায় আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি ভাঙা আর নষ্ট ইট দিয়ে কাজ চলছে। ইঞ্জিনিয়াররা এসে দেখে যান, কিন্তু কাজের কোনো উন্নতি হয় না। এই রাস্তা বেশিদিন টিকবে বলে মনে হয় না।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারের প্রতিনিধি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মুন্নি বেগম অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “স্থানীয়রা বহুবার অভিযোগ দিয়েছেন, ইঞ্জিনিয়াররাও কাজ দেখে গেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। অভিযোগ দিলে কিছু আসে যায় না।”
প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরীর অতীত রেকর্ডও বিতর্কমুক্ত নয়। এর আগে তিনি কর্ণফুলী উপজেলায় কর্মরত থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। এ এইচ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হারুন বলেন, “জাহিদ আলম খুব তীক্ষ্ণ প্রকৌশলী। কর্ণফুলীতে থাকাকালীন টেন্ডার ছাড়াই তিনি আমার কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দিয়েছিলেন এবং বিল পেতেও কোনো সমস্যা হয়নি।” যদিও তার এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নিয়ম ভাঙার ইঙ্গিত। সে সময়েও তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাকে কর্ণফুলী থেকে বদলি করা হয়।
এইসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যান। প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে তিনি অফিসে এসে চা পানের আমন্ত্রণ জানান। যখন পুনরায় অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ফোন কেটে দেন এবং এরপর একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সাথে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, প্রকৌশলীর দাবিকৃত অর্থে ভাগ নেওয়ার বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আকতার বলেন, “নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান আলীও বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, অতীতের মতোই এবারও তদন্তের আশ্বাস কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।
