:: একুশে প্রতিবেদক ::
চট্টগ্রাম: নগরীর জিইসি মোড় এলাকা। গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়টি পড়েছে তিনটি থানার সীমানা এলাকায়। মোড়ের পশ্চিম পাশ ও জাকির হোসেন রোড়ের দায়িত্ব খুলশী থানার উপর। উত্তর-পূর্বদিকের অংশটা পড়েছে পাঁচলাইশ থানার অধীনে। আর দক্ষিণ-পূর্ব পাশের অংশটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চকবাজার থানাকে। এভাবে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও একই এলাকায় পড়েছে একাধিক থানার সীমানা। এক থানার পুলিশ সচরাচর অন্য থানা এলাকায় অভিযানে যায় না। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। এসব এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে ‘সীমানার’ দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। ফলে থানার সীমানা এলাকায় বাড়ছে অপরাধীদের দৌরাত্ম!
এর সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে, গত ৫ মে জিইসি মোড়ে ছুরিকাঘাত ও গুলিতে খুন হন এসপিপত্মী মাহমুদা খানম মিতু। তিনটি থানার সীমানা এলাকায় ঘটে নির্মম এই হত্যাকান্ড। এতে প্রশ্ন উঠেছে, তিনটি থানা পুলিশের টহল দলের ও সীমানা এলাকায় পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়ে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, একটি মোড়ে বা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একাধিক থানার সীমানা রয়েছে। জিইসি মোড়ে সন্ধ্যা হলেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অস্ত্রসহ বিভিন্ন মামলার আসামি সন্ত্রাসীরা অবস্থান নেয়। নানা অপরাধ পরিকল্পনা জিইসি থেকেই হয়ে আসছে বলে তথ্য রয়েছে। জিইসি এলাকাটি তিনটি থানার সীমানায় পড়ায় দায়িত্ব পালন নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা।
এদিকে থানার সীমানা এলাকায় অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটলে তার দায়-দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর মধ্যে ঠেলাঠেলিও হচ্ছে। এমনকি এসব এলাকায় অবস্থানরত সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক থানার সীমানা সম্পর্কেও জানতে পারছে না। আইনগত কোন সমস্যায় পড়লে তাদের ছুটতে হয় এক থানা থেকে আরেক থানায়। শুধু তাই নয়; থানার সীমানায় ছিনতাই, হত্যাসহ নানা অপরাধের অভিযোগ করতে থানায় গেলে সেবা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।
এ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজাহাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত ২০ মে সকাল ৯টার দিকে সুগন্ধা আবাসিকের বাসা থেকে বের হয়ে জিইসি মোড়ে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে প্রবর্তকের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছেই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ি। মুহুর্তেই তারা আমার অ্যান্ড্রয়েড সেট ও মানিব্যাগ নিয়ে পালায়। এসময় ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্টের পরামর্শে অভিযোগ দিতে পাঁচলাইশ থানায় গিয়েছিলাম। এরপর ডিউটি অফিসার জানালেন ওই এলাকাটা চকবাজার থানার অধীনে। ওইদিন বিকেলে চকবাজার থানায় গেলে ডিউটি অফিসারের দায়িত্বে থাকা এক নারী এসআই জানালেন, ঘটনাস্থল পাঁচলাইশে পড়েছে। এরপর আর পাঁচলাইশ থানায় যাইনি।’
জানা গেছে, গোলপাহাড় মোড়ে রয়েছে পাঁচলাইশ ও চকবাজার থানার সীমানা; ২নং গেইট মোড়ে রয়েছে খুলশী ও পাঁচলাইশ থানার সীমানা। বহদ্দারহাট মোড়ে আছে চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ থানার সীমানা। গুলজার মোড়ে পড়েছে চকবাজার ও পাঁচলাইশের সীমানা। টাইগারপাস মোড়ে রয়েছে কোতোয়ালী ও খুলশী থানার সীমানা। অলংকার মোড়ে রয়েছে আকবরশাহ ও পাহাড়তলী থানার সীমানা। নিউমার্কেট মোড়ে কোতোয়ালী ও সদরঘাট থানার সীমানা। বারেক বিল্ডিং মোড়ে সদরঘাট ও বন্দর থানার সীমানা। কর্ণফুলী ইপিজেড মোড়ে ইপিজেড ও পতেঙ্গা থানার সীমানা। ফয়’স লেক মোড় খুলশী ও আকবর শাহ থানার সীমানায়।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মোঃ ইকবাল বাহার বলেন, ‘বিভিন্ন মোড়ে একাধিক থানার সীমানা পড়ার বিষয়টি আজকে নতুন হয়নি। অনেক আগে থেকে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন রাতারাতি এটা পুণঃনির্ধারণ করাও সম্ভব না। আর এটা দ্রুত সমাধান যোগ্য বিষয়ও না।’
অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে একাধিক থানার সীমানা থাকায় শিথিল থাকছে নিরাপত্তা। ফলে এসব এলাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম বেশী। ব্যস্ততম মোড়গুলোর ফুটপাত ও মাদক স্পটগুলো থেকে ‘মাসোহারা’ আদায়ের লোভে এসব এলাকাকে কোন থানা হাতছাড়া করতে রাজী নয়। এ নিয়ে দ্বন্ধ থামাতে ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ক্রাইম জোন’ ভাগ করে দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়।
ফয়’স লেক দ্বিমুখী সড়কের বিভাজক ধরে একপাশে খুলশী ও অন্যপাশে আকবরশাহ থানার দায়িত্ব। ফয়’স লেক সড়কের দুই পাশের যেসব হোটেল রয়েছে, তাতে অবৈধ কাজ চলে- বলে অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে পর্যটন স্পট পারকি বিচ পড়েছে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী থানার সীমান্তে। অভিযোগ আছে, পারকি বিচ এলাকায় মাদক স্পটগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয় পুলিশ। গত ৩১ জুন রাতে ওই এলাকায় ‘অভিযানে’ গিয়ে হামলার শিকার হন নগর গোয়েন্দা পুলিশের চার সদস্য।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘একাধিক থানার সীমানা পড়া গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও এলাকাগুলোতে অপরাধীদের দৌরাত্ম বেশী দেখা যায়। ব্যস্ততম এসব এলাকা যে কোন একটি থানার অধীনে হওয়া উচিত। এতে ওই এলাকার সঠিক নিরাপত্তা বিধানে সংশ্লিষ্ট থানার উপর সুনির্দিষ্ট দায়-দায়িত্ব থাকবে।’
