
খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় স্কুলছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে ডাকা সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন।
রোববার এই ঘটনায় সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও পুলিশ সদস্যসহ আরও অনেকে আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পর উপজেলার রামেসু বাজারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, এতে পুড়ে গেছে বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও ঘরবাড়ি।
নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের মরদেহ খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবিব পলাশ তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, “গুইমারায় গুলিতে তিনজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। তবে কার গুলিতে বা কীভাবে তারা মারা গেছেন, তা বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি।”
এদিকে এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, “দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি নিহত এবং মেজরসহ ১৩ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্য ও আরও অনেকে আহতের ঘটনায়” মন্ত্রণালয় গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অপরাধীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সবাইকে ধৈর্য ধরে শান্ত থাকার জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে অবরোধের সমর্থনে রোববার দুপুরে গুইমারা খাদ্যগুদামের সামনে সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়, যা এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
মংসাজাই মারমা ও কংজরী মারমা নামে দুই প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগ, কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এরপর লোকজন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করলে ২০-২৫ জনের একটি দল রামেসু বাজারে ঢুকে লুটপাট চালায় এবং দোকানপাট ও মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মুখ ঢাকা ছিল বলেও জানান তারা।
আগুনে বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়, যার অধিকাংশের মালিক পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বলে জানা গেছে।
গুইমারা থানার ওসি মো. এনামুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, অবরোধ নিয়ে পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও ঝামেলা হয়েছে। তিনি বলেন, “এখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।”
‘উভয়ের অপরিণত আচরণ’
ঘটনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও অবরোধের নেতৃত্বদানকারীদের ‘অপরিণত আচরণকে’ দায়ী করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা।
তিনি বলেন, “আমার কাছে ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক মনে হচ্ছে। ১৪৪ ধারা জারির পরও এমন ঘটনা ঘটার কথা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী তিনজনের বেশি মানুষ জড়ো হতেই পারবে না, অথচ সেখানে দল বেঁধে মিছিল হয়েছে। আমি বলব, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব—উভয়েরই অপরিণত আচরণের জন্য এটা হয়েছে।”
থমথমে পরিস্থিতি
এ ঘটনার পর গুইমারা উপজেলাসহ পুরো খাগড়াছড়িতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শহরের মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং রাস্তায় বের হওয়া সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার এক স্কুলছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই খাগড়াছড়িতে উত্তেজনা চলছিল। এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের শাস্তির দাবিতে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ শনিবার ভোর থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়।
