রামু ট্র্যাজেডির ১৩ বছর: সাক্ষী না আসায় ঝুলে আছে ১৮ মামলা


ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর চালানো নারকীয় হামলার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার শেষ হয়নি। সাক্ষীরা আদালতে না আসায় ঝুলে আছে ১৮টি মামলার বিচারকাজ।

ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, রাষ্ট্র ছবি ও ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে বিচার করতে পারলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার ও মূর্তি ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে রামুতে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। ওই রাতে শত বছরের পুরোনো ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও ৩০টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এর পরদিন পার্শ্ববর্তী উখিয়া, টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের পটিয়াতেও বৌদ্ধ বিহারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১৯টি মামলা করে, যাতে ৩৭৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ থেকে ১৬ হাজার জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে একটি মামলা উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসা হওয়ায় আদালত থেকে খারিজ হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে মামলাগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বহু নিরীহ মানুষকে আসামি করে। অন্যদিকে ঘটনায় জড়িত ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়নি বলে বিতর্ক ওঠে। এ কারণে সাক্ষীরাও সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বলে মনে করেন অনেকে।

রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া বলেন, “দুর্বৃত্তদের কোনো জাতি বা সম্প্রদায় নেই। তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অন্যথায় সমাজে দুর্বৃত্তায়ন বাড়তেই থাকবে।”

সেই রাতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের অধ্যক্ষ শীলপ্রিয় থের বলেন, “ধ্বংস হয়ে যাওয়া বৌদ্ধ বিহারগুলোর অমূল্য সম্পদ আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। ঘটনাটি মনে পড়লে এখনো কান্না আসে। দুর্বৃত্তরা আমাদের বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধপল্লি পুড়িয়ে শত শত বছরের পুরোনো মূর্তিসহ সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।”

এক যুগেও কাউকে বিচারের মুখোমুখি করতে না পারায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে মনে হচ্ছে, বিচারের জন্য আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। শুরু থেকেই এ ঘটনা নিয়ে রাজনীতি হয়েছে।”

মামলাগুলোর বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অনেক। কিন্তু সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। এটিই মামলার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম প্রধান কারণ।”