ফটিকছড়ি পল্লী বিদ্যুৎ: দুর্নীতির আখড়ায় ইউএনও’র হানা, উন্নতির আশ্বাস


নতুন সংযোগ, মিটার স্থাপন, খুঁটি সরানো কিংবা ট্রান্সফরমার পরিবর্তন—চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পল্লী বিদ্যুতের কোনো সেবাই মেলে না ঘুষ ছাড়া। কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে লাইনম্যান আর ঠিকাদারদের নিয়ে গড়ে ওঠা এক সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার গ্রাহক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দালালদের দৌরাত্ম্য। ভুতুড়ে বিল, গ্রাহক হয়রানি আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মতো যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ জনজীবন।

অবশেষে এই ‘তামাশা’ বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছেন খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। গ্রাহকদের সীমাহীন দুর্ভোগ ও ক্ষোভের কথা জানিয়ে তিনি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিলে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মামুনুর রশীদ সশরীরে উপজেলায় ছুটে এসে উদ্ভূত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

জানা যায়, চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর অধীনে ফটিকছড়িতে ১৯৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যালয়ের প্রায় সবাই কমবেশি ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা অফিসে বসেই মনগড়া ইউনিট লিখে গ্রাহকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন ভৌতিক বিল। অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করলে সেবা মেলার বদলে মেলে দুর্ব্যবহার, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ফোন ব্যস্ত রাখা হয়।

ফটিকছড়ি উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম এস আকাশ বলেন, “এখানকার পল্লী বিদ্যুৎ নিয়ে এক প্রকার তামাশা চলছে। কর্মকর্তারা অভিযোগ শোনার পরিবর্তে গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।”

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন দিয়েও সেবা পাওয়া যায় না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়।”

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দিনে ১০-১৫ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। রাতের বেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি ঘটে গত ২৭ সেপ্টেম্বর। কোনো ঘোষণা ছাড়াই সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখলে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিকার চেয়ে পরদিনই (২৮ সেপ্টেম্বর) ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর কড়া ভাষায় একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি গ্রাহকদের ক্ষোভ, নানা অনিয়ম এবং এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। চিঠির অনুলিপি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতেও পাঠানো হয়।

এই চিঠির জের ধরেই সোমবার ফটিকছড়িতে ছুটে আসেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মামুনুর রশীদ। ইউএনও’র কার্যালয়ে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

মো. মামুনুর রশীদ বলেন, “বিদ্যুতের জোগান রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না হলেও এ খাতে কঠোর শৃঙ্খলা আনা হবে। ভুতুড়ে বিল, দালালদের দৌরাত্ম্য ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করা হবে। এখন থেকে গ্রাহকের ফোন রিসিভ করতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হলে আগেই প্রচার চালানো হবে।” তিনি গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার আশ্বাস দেন।

আলোচনা শেষে ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “গ্রামে বিদ্যুতের গুরুত্ব বেড়েছে, তাই গ্রামের চাহিদা বেশিদিন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করে এর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। গ্রাহক সন্তুষ্টিকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। আশা করি, এই আলোচনার মাধ্যমে সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।”