ভাড়ার নৈরাজ্যে জিম্মি হাটহাজারীর জনজীবন


চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসদরের বাতাসে যেন মিশে আছে এক নীরব হয়রানির গল্প। প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাগামহীন ভাড়া। একসময়ের সহজলভ্য এই বাহনটি এখন মধ্যবিত্তের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, চালকদের স্বেচ্ছাচারিতায় যাত্রীরা যেন নিজ শহরেই জিম্মি। পৌরসভা জুড়ে এই ভাড়া নিয়ে চলছে এক অঘোষিত নৈরাজ্য, কিন্তু এর লাগাম টানার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বললেই চলে।

পৌরসভার অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক, কোথাও ভাড়ার কোনো নির্দিষ্ট তালিকা চোখে পড়ে না। এই সুযোগে চালকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকছেন। যে পথের ভাড়া আগে ছিল দশ টাকা, আজ সেখানে যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চালকদের এই ‘গলা কাটার’ প্রবণতা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। পৌরসভার বাস স্টেশন থেকে মেখল আজিজিয়া মজিদিয়া সড়কে এই সমস্যা আরও প্রকট। কোনো নিয়ম বা তালিকার বালাই না থাকায় চালক ও যাত্রীদের মধ্যে বচসা ও অপ্রীতিকর ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

এই বর্ধিত ভাড়া সাধারণ মানুষের জীবনে ফেলেছে গভীর প্রভাব। মো. রফিক একজন যাত্রী তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদিন এত টাকা ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা অসম্ভব। প্রশাসনের উচিত কিলোমিটার প্রতি একটি নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া এবং তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।”

একই ধরনের হতাশার সুর স্কুল শিক্ষিকা ফাহমিদা খানমের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে রিকশার ভাড়া যে হারে বেড়েছে, তা রীতিমতো অস্বাভাবিক। আমাদের বেতন তো সেই হারে বাড়েনি। জিনিসপত্রের দাম, বাড়ি ভাড়া, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ—সবকিছু মিলিয়ে এমনিতেই হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর যদি রিকশা ভাড়াও এত বেড়ে যায়, তাহলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।”

ভোগান্তির চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেখল ফকিরহাট এলাকার গৃহিণী নাসরিন নাহার নিপার অভিজ্ঞতায়। তিনি জানান, কিছুদিন আগেই বাস স্টেশন থেকে মেখল ফকিরহাট যাওয়ার পর ১৫ টাকার ভাড়া তার কাছে ৩০ টাকা দাবি করে বসেন অটোরিকশা চালক। সেলি আক্তার নামের একজন অভিভাবকের দুর্ভোগ আরও বেশি। মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়ার জন্য তাকে দিনে ছয়বার এই সড়কে চলাচল করতে হয়। তিনি বলেন, “সিএনজি এবং অটোরিকশা চালকরা একেকবার একেকরকম ভাড়া দাবি করে, যা খুবই বিরক্তিকর।” এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেতে সেলি আক্তার বাস স্টেশন এলাকায় একটি দৃশ্যমান ভাড়ার তালিকা এবং অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন চালুর দাবি জানান।

তবে এই মুদ্রার অপর পিঠও রয়েছে। চালকদের দাবি, গাড়ির জমা, চার্জিং খরচ, যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে তারা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের ভাষ্যমতে, সারাদিনের আয় থেকে সব খরচ বাদ দিলে নিজেদের জন্য সামান্যই অবশিষ্ট থাকে।

ভাড়ার এই নৈরাজ্যের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার সংখ্যাবৃদ্ধি পৌরসদরে তৈরি করেছে তীব্র যানজট। বাস-স্টেশন, বাজার, কাচারি রোড, কলেজ গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে যানজটের কারণে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সম্প্রতি হাটহাজারীর বুড়িশ্চর ইউনিয়নে বেপরোয়া গতির অটোরিকশার চাপায় চার বছর বয়সী এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ভয়াবহতাকেই সামনে এনেছে।

পৌর এলাকার সাধারণ মানুষ এখন এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চায়। তারা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা তৈরি এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জনদুর্ভোগ লাঘবে শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মু. আবদুল্লাহ আল মুমিনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে কথা বলে এই জনদুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। হাটহাজারীর হাজারো মানুষ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের দিকেই তাকিয়ে আছেন।