
তানজিনা আফরোজের কাঁধেই ছিল পুরো সংসারের ভার। স্ট্রোক করে আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামী, শয্যাশায়ী অসুস্থ মা আর দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ—সবকিছুই তিনি সামলাচ্ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের একজন জুনিয়র অফিসার হিসেবে। চট্টগ্রামের এই নারী কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন নিজের চাকরির আয়ে। কিন্তু অক্টোবরের এক সকালে এক ঝটকায় তার পায়ের তলার মাটি সরে যায়।
গত ৭ অক্টোবর তানজিনা আফরোজ জানতে পারেন, তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পরদিনই তার বেতনের সেলফিন অ্যাকাউন্ট এবং খিদমা কার্ড দুটোই বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নাভেজা কণ্ঠে তানজিনা বলেন, “গত মাসের বেতনটাও তুলতে পারিনি। বাসা ভাড়া বকেয়া পড়েছে। হয়তো এই মাসেই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে হবে।”
তানজিনা একা নন। তার মতো ইসলামী ব্যাংকের সাড়ে চার হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী আজ একই পরিস্থিতির শিকার। তাদের সবার অভিযোগ, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং তাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়ে এক অমানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের শুরুতে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালের পর নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য একটি ‘দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার’ নির্দেশ দেয়। কিন্তু কর্মকর্তারা এটিকে দক্ষতা যাচাইয়ের নামে নতুন নিয়োগ পরীক্ষা বলে আখ্যা দেন। তাদের অভিযোগ, এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো কর্মীদের ছাঁটাই করে নতুন নিয়োগ দেওয়া। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। ফলে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা এই পরীক্ষা বর্জন করেন। আর তারপরই নেমে আসে খড়্গ। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই হাজার হাজার কর্মকর্তা বরখাস্তের নোটিশ পান।
তানজিনা আফরোজ বলেন, “আমরা তো পরীক্ষা দিতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু নোটিশে দেখলাম লেখা আছে, এটা একটা নিয়োগ পরীক্ষা। আমরা তো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমেই চাকরি পেয়েছি, তাহলে আবার কেন নিয়োগ পরীক্ষা দেব? এই প্রশ্ন থেকেই আমরা সবাই পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিই।” ২০১৯ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা বলেন, “হেড অফিস থেকে কাজের জন্য একাধিকবার প্রশংসাপত্রও পেয়েছি। আর আজ হঠাৎ করেই আমাদের অযোগ্য বলা হচ্ছে।”
এই গণহারে চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মকর্তারা নীরব মানববন্ধন শুরু করেন। চাকরিতে পুনর্বহাল, বন্ধ হওয়া অ্যাকাউন্ট চালু করা এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে লিখিত ক্ষমা প্রার্থনাসহ ছয় দফা দাবিতে তারা সোচ্চার হন। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে তাদের এই নীরব প্রতিবাদ বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে চাকরি হারানো কর্মকর্তাদের ভিড়ে। তাদের চোখেমুখে ছিল ক্লান্তি, আতঙ্ক আর ক্ষোভ। “আমরা বিচার চাই, দয়া না”—এই স্লোগানে তারা তাদের বঞ্চনার কথা জানান দেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এস এম এমদাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত সাড়ে চার হাজারের বেশি কর্মকর্তার চাকরি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের অপরাধ কী, তা আমরা জানি না। আমরা তো ব্যাংককে এগিয়ে নিতেই কাজ করেছি।” তিনি অভিযোগ করেন, বিশেষ করে চট্টগ্রামের কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং একটি মহল রাজনৈতিক অপপ্রচার চালিয়ে সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
আন্দোলনরত কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করা হয়নি। এস এম এমদাদুল ইসলাম বলেন, “আমরা ধৈর্য ধরেছি, কিন্তু আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা ব্যাংক ধ্বংস করতে চাই না, কিন্তু বাঁচার তাগিদে রাস্তায় নামতে বাধ্য হব।”
সংবাদ সম্মেলন থেকে কর্মকর্তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমদাদুল ইসলাম বলেন, “২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই নতুন বাংলাদেশে আমরা এমন অন্যায় মেনে নিতে পারি না।” তার এই বক্তব্যের সময় মিলনায়তনে উপস্থিত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বাইরে তখন স্লোগান চলছিল, “আমরা ইসলামী ব্যাংক গড়েছি, এখন আমাদেরই ভাঙছে।”
এই স্লোগানের প্রতিধ্বনি যেন তানজিনা আফরোজের কথাতেও। ভারী কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। তাদের ফি বাকি। স্বামীর ওষুধ কেনার টাকাও নেই। কীভাবে বাঁচব জানি না।”
একটু থেমে তিনি যোগ করেন, “আমরা ঘাম ঝরিয়ে এই ব্যাংককে আজকের জায়গায় এনেছি। অথচ এখন মনে হচ্ছে, আমরা যেন কখনোই এখানে ছিলাম না।”
হাজারো কর্মকর্তার এই আর্তনাদ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে। ফলে এই সাড়ে চার হাজার পরিবারের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো কুয়াশায় ঢাকা।
