গাড়ি গেলেই কাঁপে ভবন, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা


পাশের ঢাকা-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক ধরে যখন কোনো ভারী যান ছুটে যায়, তখন কেঁপে ওঠে পুরো ক্লাসরুম। দেয়ালের কম্পনের সাথে সাথেই ছাদ থেকে ঝরে পড়ে সিমেন্ট-বালির গুঁড়ো, কখনো বা বড় এক টুকরো প্লাস্টার। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাগানবাজার ইউনিয়নের করালিয়া দরগাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর কাছে এটি এখন এক নিত্যদিনের আতঙ্ক। এখানে জ্ঞানার্জনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে জীবন বাঁচানোর ভয়।

একটি জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত ভবনের নিচে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরাও। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে শিশুদের সাময়িক মুক্তি দিতে উপজেলা প্রশাসন একটি টিনশেড ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও, মূল সংকট রয়েই গেছে।

সরেজমিনে স্কুলটিতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। ১৯৯৪ সালে নির্মিত একমাত্র পাকা ভবনটি যেন নিজেই তার জীর্ণদশার সাক্ষী দিচ্ছে। দেয়ালজুড়ে ক্ষতের চিহ্ন, পিলারগুলো নড়বড়ে, ছাদ আর দেয়ালের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে পড়েছে মরিচা ধরা রড। চারটি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে দুটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত। বাকি দুটি কক্ষে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চলছে পাঠদান আর দাপ্তরিক কার্যক্রম। বর্ষা এলে এই ভোগান্তি পৌঁছায় চরমে। ছাদ চুইয়ে পড়া পানিতে ভেসে যায় ক্লাসরুম, ভিজে একাকার হয় বই-খাতা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের সময়ই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় মাত্র ৩০ বছরের মাথায় ভবনটি এমন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে বাড়ি ফিরে স্বস্তিতে থাকতে পারেন না অভিভাবক ওমর ফারুক। তিনি বলেন, “স্কুল ভবনটি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। বাচ্চাকে স্কুলে পাঠিয়ে সারাক্ষণ এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়।”

এই আতঙ্ক যে কতটা বাস্তব, তা ফুটে ওঠে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস ও চতুর্থ শ্রেণির আব্দুল্লাহ আল মায়েদের কথায়। তারা বলে, “রাস্তা দিয়ে বড় গাড়ি গেলেই আমাদের স্কুল বিল্ডিংটা থরথর করে কাঁপে। প্রায়ই ছাদ থেকে প্লাস্টার খসে পড়ে। গত মাসেও প্লাস্টার পড়ে আমাদের কয়েকজন বন্ধুর মাথা ফেটে গিয়েছিল। সব সময় ভয়ে থাকি, কখন জানি মাথার ওপর ছাদ ভেঙে পড়ে।”

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পারুল বালা দাশ তার অসহায়ত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, “আমরা নিজেরাই ভয়ে ভয়ে ক্লাস নিই। চারটি কক্ষের দুটি ব্যবহার করার কোনো উপায় নেই। বাকি দুটি জরাজীর্ণ কক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস ও অফিসের কাজ চালাতে হচ্ছে। ইউএনও মহোদয় একটি অস্থায়ী টিনশেড ভবন করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, কিন্তু সেটির কাজ এখনো শুরু হয়নি।”

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হাসান মুরাদ চৌধুরী এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী—দুজনই ভবনটির চরম ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানান, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ঝুঁকি এড়াতে উপজেলা প্রশাসন থেকে অস্থায়ীভাবে একটি টিনশেড ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে একটি অস্থায়ী টিনশেড ভবন কি ৮৫টি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে? স্থায়ী একটি পাকা ভবনের স্বপ্ন কবে সত্যি হবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে করালিয়া দরগাহ স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর আতঙ্কিত অভিভাবকদের মনে।