
“আল্লাহ যা করে,”— গলার স্বরটা ক্লান্ত শোনায় ভোলার বাসিন্দা নুরুল হাকিমের। চট্টগ্রামের রাউজানের বাগোয়ানে দিনমজুরের কাজ করেন তিনি। বিল থেকে ফেরার পথে কুকুর কামড়ে দিয়েছিল পায়ে। ছুটে গিয়েছিলেন রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ড্রেসিং করে মিলল এক টুকরো কাগজ, তাতে লেখা টিকার নাম। হাসপাতালে টিকা নেই।
নুরুল হাকিমকে বলা হলো শহরে জেনারেল হাসপাতালে যেতে অথবা ফার্মেসি থেকে টিকা কিনে নিতে। সেদিনের মতো ৫০০ টাকা খরচ করে একটি টিকা তিনি নিলেন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও চারটি টিকা নেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। নুরুল হাকিম বলেন, “আমার দ্বারা এত টাকা ব্যয় করে টিকা নেওয়া সম্ভব না।” শেষ পর্যন্ত এক মহিলার কাছ থেকে ‘স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ’ বা ‘কলা পড়া’ খেয়ে নিয়েছেন তিনি। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েও ভাগ্যের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে তাকে।
নুরুল হাকিমের এই অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত এক বছর ধরে জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক রোগের বিনামূল্যে টিকা সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। একসময় এই হাসপাতালেই টিকা মিললেও এখন ভরসা কেবল বাইরের ফার্মেসি, যা এলাকার গরিব ও অসহায় মানুষদের জন্য এক বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ের ক্ষেত্রে আঘাতের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নেওয়া জরুরি, অন্যথায় রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় শতভাগ। সম্প্রতি দেশে কুকুর-বিড়ালের আঁচড়ের পর টিকা না নেওয়ায় কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ এই জীবনরক্ষাকারী টিকার জন্যই মানুষকে ঘুরতে হচ্ছে।
স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতে প্রতিটি টিকার দাম পড়ছে ৪৫০ থেকে প্রায় ৫০০ টাকা। কুকুরে কামড়ালে একজন আক্রান্ত ব্যক্তিকে মোট পাঁচটি টিকা নিতে হয়, আর বিড়ালে আঁচড়ালে তিনটি। এই খরচ জোগাতে না পেরে অনেকেই শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কবিরাজের কাছে ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নিচ্ছেন, যা জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রাউজান সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আনিসুর রহমান ঠিক এমনই এক ঘটনার সাক্ষী। তিনি বলেন, “আমার মাকে বিড়াল কামড় দিয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানায় টিকা নেই, জরুরি বিভাগে তারা একটা কাগজের টুকরায় টিকার নাম লিখে দিয়ে বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনে নিতে বলেন।” নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের গেটের সামনের ফার্মেসী থেকে ৪৫০ টাকা দিয়ে টিকা কিনে মাকে দেন আনিসুর রহমান। তিনি আরও বলেন, “এইদিন একব্যাক্তি কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত তার ছেলেকে নিয়ে এসেছিল। তাকে ড্রেসিং করে কাগজের টুকরা ধরিয়ে দেয়। টাকা না থাকায় তিনি টিকা না মেরে চলে যায়।”
তবে সবাই যে ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করছেন, তা নয়। নাসিমা বেগম নামে স্থানীয় এক রোগী জানান, হঠাৎ এক বিড়াল তাকে আঁচড়ে দিলে তিনি দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে আসেন। সেখানকার জরুরি বিভাগের এক মহিলা ডক্টর তাকে ৩টি টিকা গ্রহণ করতে বলেন। নাসিমা বেগম বলেন, হাসপাতালে বিনামূল্যে টিকা না পেয়ে তিনি স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ৪৫০ টাকা দরে মোট ১৩৫০ টাকা খরচ করে তিনটি টিকা কেনেন। তিনি জানান, ঘটনার পর তাকেও ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি চিকিৎসকের পরামর্শই গ্রহণ করেন।
স্থানীয় সূত্রমতে, ভাদ্র-আশ্বিন-কার্তিক মাস কুকুরের প্রজনন ঋতু হওয়ায় এ সময় কামড়ের ঘটনা অনেক বেড়ে যায়। কখনও কখনও দিনে ১০-১৫ জন পর্যন্ত মানুষ কুকুরের আক্রমণের শিকার হন, যাদের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত বছর থেকে টিকার সরবরাহ বন্ধ। বাধ্য হয়ে আক্রান্তদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যেতে বলা হয়, কিন্তু অনেকে সেখানে যেতে পারেন না। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই সংকট বিষয়ে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, “বিগত এক বছর ধরে আমাদের এখানে জলাতঙ্কের টিকার সরবরাহ নেই। ৩টা টিকা মজুদ ছিল তা গত মাসে শেষ হয়েছে।” তিনি জানান, তারা চলতি বছরের ৩ মে ৫০০ টি র্যাবিজ ভ্যাকসিন ইমোনোগ্লুবুলিন, ৫০০ টি র্যাবিজ ভ্যাকসিন হিউম্যান বি পি ও ১০ টি ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রারের চাহিদা প্রেরণ করেছেন, কিন্তু এখনও তা এসে পৌঁছেনি। ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “সরবরাহ না থাকলে আমরা দিব কিভাবে। আশা করছি শিগগিরই টিকা পাওয়া যাবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, অন্তত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যায়ে বিনামূল্যে রেবিস টিকার এই সংকট গ্রহণযোগ্য নয়। জরুরি ভিত্তিতে এই টিকা মজুদ রাখা আবশ্যক, যেন নুরুল হাকিম বা আনিসুর রহমানের দেখা সেই অসহায় বাবার মতো কাউকে টাকার অভাবে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে না হয়।
