
চট্টগ্রামের দক্ষিণের সবুজে মোড়া উপজেলা সাতকানিয়া। পাহাড়, নদী আর প্রাচীন বৃক্ষের ছায়ায় শীতল এই জনপদের মানুষ প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু সেই শান্ত প্রকৃতিতে এখন উন্নয়নের করাত ধেয়ে আসছে। উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া রাস্তার মাথা পর্যন্ত চার কিলোমিটার পথের চিরচেনা সঙ্গী ৭৮২টি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ এখন শুধুই নিলামের অপেক্ষায়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ (সিডিডব্লিউএসপি)’ প্রকল্পের আওতায় ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সড়কটি সম্প্রসারণ করছে। প্রকল্পের অধীনে ১২ ফুটের ছায়াঘেরা শান্ত পথটি চওড়া হয়ে ১৮ ফুট হবে। প্রশ্ন উঠেছে, যে সড়কটি উপজেলার প্রধান কোনো সংযোগ সড়ক নয়, সেই পথের জন্য এত বড় সবুজ বলিদানের আদৌ প্রয়োজন আছে কি?
এবিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে অবশ্য বলছেন, উন্নয়নের স্বার্থে কিছু গাছ কাটা অনিবার্য। তিনি জানান, ৭৮২টি গাছ কাটার অনুমোদন এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। সবুজ কুমার দে প্রতিশ্রুতির সুরে এও জানান, প্রতিটি কাটা গাছের বদলে দুটি করে নতুন গাছ লাগানো হবে।
কিন্তু উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে-এর এই আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। তাদের ক্ষোভ, “যে সংস্থা গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, সেই সংস্থাই এখন করাত হাতে নামছে!” সাতকানিয়া পৌরসভার বাসিন্দা আহমদুল হক এই প্রকল্পকে ‘অপচয়’ হিসেবে দেখছেন। আহমদুল হক বলেন, “এটি উপজেলার মূল যাতায়াত সড়ক নয়। অল্প সংখ্যক মানুষ ও শিক্ষার্থী ছাড়া খুব কম মানুষ এই পথে চলাচল করেন। কোটি টাকার প্রকল্প আর শত শত গাছ কাটা—এটা উন্নয়ন নয়, অপচয়।”
দক্ষিণ ঢেমশার বাসিন্দা নাসির উদ্দিনের উদ্বেগ আরও গভীর। এই গাছগুলো কেটে ফেলার পরিণতি নিয়ে নাসির উদ্দিন বলেন, “এই গাছগুলো আমাদের ছায়া দিত, বাতাস ঠান্ডা রাখত। এখন সেগুলো কেটে ফেললে আমাদের সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে গরমে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
এদিকে, গাছগুলো কাটার প্রক্রিয়াও থেমে নেই। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের মাদার্শা রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন জানান, ৭৮২টি গাছের বাজারমূল্য ১৮ লাখ ১৮ হাজার ৯৪২ টাকা ধরা হয়েছে এবং দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয় তরুণ সায়েদ হোসেন মানিকের কাছে এই গাছগুলো কেবল গাছ নয়, স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সায়েদ হোসেন মানিক আক্ষেপ করে বলেন, “এই গাছগুলোর নিচে আমরা বড় হয়েছি। প্রতিটি গাছে ছিল শৈশবের গল্প। সেগুলো কেটে দিলে সাতকানিয়ার আত্মাই হারিয়ে যাবে।”
স্থানীয়দের এই আশঙ্কা অমূলক নয়। পরিবেশবিদদের মতে, এই বিশাল সবুজ আচ্ছাদন একবারে সরিয়ে ফেললে এলাকার তাপমাত্রা গড়ে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, পাখি, বাদুড়, মৌমাছি ও কাঠবিড়ালির মতো ক্ষুদ্রপ্রাণীরা তাদের চিরচেনা আশ্রয় হারাবে, যা এই অঞ্চলে এক ধরনের স্থানীয় পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
এই ঘটনাই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, উন্নয়ন কি সত্যিই রাস্তা চওড়া করা, নাকি প্রকৃতির হৃদয়ে করাত বসানো? ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কংক্রিট হয়তো চকচকে পথ দেবে, কিন্তু ৭৮২টি গাছের বিনিময়ে সাতকানিয়া যে শীতল ছায়া, যে প্রাণবৈচিত্র্য আর নির্মল বাতাস হারাবে, তা আর কোনোদিন ফিরবে না।
