
প্রকাশ্যে দিবালোকে ভাইকে পিটিয়ে আইসিইউতে পাঠানোর মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে একুশে পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে আনোয়ারা থানা পুলিশ। যে পুলিশ গত এক সপ্তাহ ভুক্তভোগী পরিবারকে ‘আদালতে যাওয়ার’ পরামর্শ দিচ্ছিল, সেই পুলিশই শনিবার (১ নভেম্বর) প্রতিবেদন প্রকাশের পরপর মূল অভিযুক্ত আহমদ ছফাকে আটক করেছে এবং দ্রুততার সাথে মামলা রুজু করেছে।
তবে, যে সাংবাদিকের কলমের খোঁচায় এই নিষ্ক্রিয় সিস্টেমের ঘুম ভাঙলো, সেই একুশে পত্রিকার আনোয়ারা-কর্ণফুলী প্রতিনিধি জিন্নাত আয়ুবের বিরুদ্ধেই এক ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন আনোয়ারা থানার ওসি মনির হোসেন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওসি তার অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে জিন্নাত আয়ুবকে ‘রিমুভ’ (অপসারণ) করে দিয়েছেন।
শনিবার সকাল থেকেই এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন মোড় নেয়। গত রবিবার (২৬ অক্টোবর) ঘটনা ঘটলেও এবং ভুক্তভোগী পরিবার থানায় গেলেও পুলিশ কোনো মামলা নেয়নি। বিচার না পেয়ে আজ সকালে ভুক্তভোগী নাজিমের স্ত্রী-সন্তান ও বোন একুশে পত্রিকার প্রতিনিধি জিন্নাত আয়ুবের বাড়িতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা অভিযোগ করেন, আসামিরা প্রভাবশালী এবং টাকা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে রেখেছে, পুলিশও ‘ম্যানেজড’।
এর আগে আনোয়ারা থানার ওসি মনির হোসেন এই সংক্রান্ত নিউজটি না করার জন্য জিন্নাত আয়ুবকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের আহাজারি এবং ঘটনার ভয়াবহতার ভিডিও প্রমাণ দেখে বিবেকের তাড়নায় জিন্নাত আয়ুব সরেজমিন তদন্তে নামেন।
বিকাল ৩টা ১৭ মিনিটে একুশে পত্রিকায় “সাপের মতো পিটিয়ে ভাইকে আইসিইউতে পাঠাল ভাই-ভাতিজা, মামলা নিচ্ছে না পুলিশ (ভিডিও)“ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
নিউজের প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়। ভুক্তভোগী নাজিমের বোন পারভিন আক্তার বিকেলে একুশে পত্রিকাকে জানান, “একুশে পত্রিকার সাংবাদিককে বক্তব্য দেওয়ার তিন ঘন্টা পর পুলিশ আমাদের ডেকেছে এবং আমাদের সাথে নিয়ে আসামি আহমদ ছফাকে আটক করেছে।”
আসামি আটকের পর সন্ধ্যায় আনোয়ারা থানা পুলিশ একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস রিলিজ জারি করে। কিন্তু জিন্নাত আয়ুব দেখেন, তাকে ওসির মিডিয়া গ্রুপ থেকে রিমুভ করা হয়েছে। ফলে অন্য এক সহকর্মীর মাধ্যমে তাকে প্রেস রিলিজটি সংগ্রহ করতে হয়। ওসির অনুরোধ উপেক্ষা করে ‘বিবেকের তাড়নায়’ সংবাদ প্রকাশ করাকেই এই অপসারণের কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেস রিলিজে যা আছে
ওসি মনির হোসেনের পাঠানো প্রেস রিলিজে জানানো হয়, ভিকটিম নাজিমের স্ত্রী সাহেদা আকতার @ মুক্তা বাদী হয়ে আনোয়ারা থানায় মামলা (নং ০১, তাং ০১/১১/২৫) দায়ের করেছেন। মামলায় (ধারা: ১৪৩/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৫০৬) মোট ০৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামী করা হয়েছে।
এজাহারে ভাতিজা মোঃ লিটনকে ১নং এবং ভাই আহমদ ছফাকে ৮নং আসামী করা হয়।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জের ধরেই এই শত্রুতা চলছিল। ঘটনার দিন (২৬ অক্টোবর) গরু চুরির ঘটনায় মোজাফফর @ কেনুকে আটকের পর ১নং ও ৮নং বিবাদীর (লিটন ও আহমদ ছফা) ইন্ধনে ও প্ররোচনায় তাকে মারধর করে নাজিমের নাম বলতে বাধ্য করা হয়।
পরে বিবাদীরা নাজিমকে ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে সৈয়দ বাড়ির মোড়ে এনে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো রাম দা, কিরিচ, লোহার রড ও গাছের বাটাম দিয়ে আক্রমণ চালায়। এজাহারে বলা হয়, “১নং বিবাদী মোঃ লিটন ধারালো রাম দা দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে জখমী মোঃ নাজিম এর মাথায় স্বজোরে কয়েকটি কোপ মেরে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে।” অন্য আসামীরাও লোহার রড ও কিরিচ দিয়ে নাজিমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপ মেরে ও পিটিয়ে হাড় ভাঙা জখম করে।
প্রেস রিলিজে পুলিশ জানায়, এজাহারভুক্ত আসামি আহমদ ছফাকে (৫৮) আটক করা হয়েছে।
এদিকে, সাংবাদিকতার চাপে পুলিশ দেরিতে ব্যবস্থা নিলেও, নাজিম উদ্দীনের অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তার স্ত্রী মুক্তা জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা তাদের ‘আল্লাহকে ডাকতে’ বলেছেন।
